শাইখ সাইফুল্লাহ ফারুকী চরণদ্বীপি

আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার বদ্বীপের চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলায় আবির্ভূত আউলাদে রাসুল (দঃ), হাসানী ও হোসাইনী বংশধারার উজ্জ্বল নক্ষত্র গাউসুল আজম হজরত শাহসুফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (কঃ) এতদঅঞ্চলে প্রসার করেছিলেন তাওহীদ ও রেসালতের সঠিক রূপরেখা ও শরীয়ত ও তরিকতের সমন্বিত ইসলামের মূলধারা।
হেদায়ত ও মারেফতের আলোকরশ্মিতে পথহারা মানবতাকে পৌঁছিয়েছেন প্রেমময় আল্লাহ তায়ালার মারেফতের স্বর্গীয় মঞ্জিল মাকসাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে। প্রবর্তন করেছেন সুমহান তরিকা ‘তরিকায়ে মাইজভান্ডারীয়া’ , যার পরশে মানব-দানব, জীন-ইনসান নির্বিশেষে ফয়েজপ্রাপ্ত হয়ে আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত অলি-আল্লাহ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। মাইজভান্ডারীয়া তরিকার স্বরূপ বিশ্লেষক হজরত শাহসুফী ‌দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারী (কঃ) এর সুযোগ্য আওলাদ হজরত শাহসুফী ডাঃ সৈয়দ দিদারুল হক মাইজভান্ডারী (কঃ) স্বীয় উৎসর্গিত সত্তার বিনিময়ে হয়েছেন আলোকিত ব্যক্তিত্ব ও আধ্যাত্মিক রাহবার ।
সুফী কেবল নিজেই আলোকিত নন; বরং তিনি আল্লাহ প্রদত্ত নুরের আলোকে মানবতাকে আলোকিত করেন। হজরত শাহসুফী ডাঃ সৈয়দ দিদারুল হক মাইজভান্ডারী (কঃ) একজন চিকিৎসক হিসেবে অসুস্থ ব্যক্তিদের সুস্থতায় চিকিৎসা সেবা প্রদান, শিক্ষাবিদ হিসেবে মাইজভান্ডার আহমদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি হিসেবে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সম্পৃক্ত থেকে শিক্ষার আলোর মশাল প্রজ্জ্বলন করা এবং সৃষ্টির সেবায় বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও রক্তদান কর্মসূচির মত সামাজিক ও মানবিক ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রাখেন। নীতি ও আদর্শের ক্ষেত্রে আপোষহীন ডাঃ বাবাজান কেবলা (কঃ) সত্যকে দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করতেন এবং তা বাস্তবায়নে তাগিদ প্রদান করতেন।
স্বীয় মুর্শিদ অছিয়ে গাউসুল আজম হজরত মাওলানা শাহসুফী ‌দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারী (কঃ)’র আদর্শে প্রতিষ্ঠিত তিনি ওফাত পর্যন্ত মাইজভান্ডারীয়া তরিকার উসুল ও মূলনীতি হৃদয়ে ধারণ ও বাস্তবায়নে ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাই তো কেউ দোয়ার করার আরজি জানালে তিনি বলতেন, ‘ দয়া ও দোয়া গাউসে পাকের নিকট। আমি কেবল তাঁরই তরিকতপর গোলাম মাত্র। ‘ কতটা বিনয়ী, অহমিকামুক্ত, পরিশুদ্ধ, আত্ননিবেদিত ও গাউসিয়তের কদমে উৎসর্গিত সত্তা হলে এমন কালাম উচ্চারিত হতে পারে তা সহজে অনুমেয়।
মাইজভান্ডারীয়া তরিকা প্রচারে উৎসর্গিত আলোকিত সত্তা হজরত শাহসুফী ডাঃ দিদারুল হক মাইজভান্ডারী (কঃ) মাইজভান্ডারী আদর্শবাহী সংগঠন ‘আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে মাইজভান্ডারী’ এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংগঠনের ব্যাপ্তি ঘটিয়ে ইমান আকিদা সংরক্ষণ পূর্বক ব্যক্তির আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মাইজভান্ডারীয়া তরিকার উসুলে সাবয়া‌ ও আদলে মতলাকের স্বরূপ প্রতিষ্ঠায় অন্যতম সফল ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
তরিকতের সবক প্রদানে তিনি শরীয়তের অনুশাসন পালনের তাগিদ প্রদান করত হাক্কুল্লাহ (আল্লাহর হক) ও হাক্কুল ইবাদ (বান্দার হক) আদায়ে ব্রতী হওয়ার নির্দেশনা প্রদান করতেন। হুজুর গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী (কঃ) এর রুহানী সন্তান খোলাফায়ে কেরামের আউলাদগণকে সাথে নিয়ে ‘শানে গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী ফোরাম’ প্রতিষ্ঠা পূর্বক মাইজভান্ডারী তরিকার সমস্ত দরবার সমূহকে এক ফ্ল্যাট ফরমে অন্তর্ভূক্ত করতঃ মাইজভান্ডারী তরিকার আদর্শিক সৌন্দর্যকে বিকশিত করণে ভূমিকা রাখেন। এরই ফলশ্রুতিতে প্রতি বছর ২৭ জিলকদ গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী (কঃ) চান্দ্র বার্ষিক ওরশ শরীফ মাইজভান্ডার দরবার শরীফের শাহী ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় ‘শান গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী ফোরাম এর ব্যানারে।
নবী করিম (দঃ) এর আউলাদ, আউলাদে গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী (কঃ) হজরত শাহসুফী ডাঃ সৈয়দ দিদারুল হক মাইজভান্ডারী (কঃ) একজন অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আল্লাহর রাসুল (দঃ) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা মুমিনের অন্তর্দৃষ্টিকে ভয় করো। কেননা তারা আল্লাহর নুরের মাধ্যমে দেখেন।’ (সুনানে তিরমিজি)
তাঁর অন্তর্দৃষ্টির প্রকৃষ্ট প্রমাণ হলো তিনি বলেন, গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী (কঃ) দুই ধরণের বস্তু রেখে যান। একটা সম্পদ আর অপরটি সম্পত্তি। সম্পদ ব্যক্তির ওফাতের পর আউলাদগণ বন্টন করে নিয়ে থাকেন। আর সম্পত্তি একান্ত নিজস্ব বস্তু যা স্বীয় মনোনীত ব্যক্তিকে প্রদান করেন। গাউসুল আজম মাইজভান্ডারীর ওফাতের পর উনার সম্পদ বন্টিত হয়েছে যা আমরা প্রাপ্ত হয়েছি যেতেতু আমরা উনার শারীরিক তথা জিসমানী আউলাদ। আর উনার সম্পত্তি হলো উনার গাউসিয়তের বেলায়ত যা তার খোলাফায়ে কেরামকে প্রদান করেছেন। এ দৃষ্টিকোন হতে উনার খোলাফায়ে কেরামগণ হলে রুহানী আউলাদ।’
হজরত শাহসুফী ডাঃ সৈয়দ দিদারুল হক মাইজভান্ডারী এই অন্তদৃষ্টি সম্পন্ন উক্তির সমর্থন পরিলক্ষিত হয় গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী (কঃ) এর প্রথম ও প্রধান খলিফা হজরত শাহসুফী অছিয়র রহমান ফারুকী চরণদ্বীপি (কঃ)’র মুখ নিঃসৃত বাণীতে, ‘আমি ও আমার পীর হযরত গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) আমরা উভয় এক আত্মা বিশিষ্ট, ভিন্ন নয়। তিনি ভিন্ন আমি নহি, আবার আমি ভিন্ন তিনি নহেন। তাঁহার আকার প্রকার অঙ্গাবয়বের সহিত ও আমি এক রঙ্গ বিশিষ্ট হইয়াছি। আমি আমাকে তাঁহার মধ্যে বিলীন করিয়া দিয়াছি। তাঁহার চিন্তাধারার গোপন রহস্য ও ভেদাভেদের ধারক ও বাহক হইয়াছি ।তাঁহাকে গাউসুল আজম রূপে সর্বপ্রথম আমি জানিয়াছি এবং তাহা সর্বত্র ব্যক্ত করিয়াছি। আমি তাঁহাকে আব্বাজান বলিয়া ডাকিয়াছি। তিনি আমাকে তাঁহার (অলদ) সন্তান বলিয়া স্বীকৃতি দান করিয়াছেন।’
আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হজরত শাহসুফী ডাঃ সৈয়দ দিদারুল হক মাইজভান্ডারী (কঃ) মুখ নিঃসৃত বাণীসমূহে উনার ব্যক্তিত্ব, তরিকতে আধ্যাত্মিক অবস্থান ও বেলায়ত প্রাপ্তি প্রতিফলিত হয়। তাঁর চিত্তাকর্ষক বাণী সমূহের অন্যতম হলো-
০১. ঐ ব্যক্তিকে প্রকৃত ইসলামী (মুসলমান) বলা হয়, যে শরীয়ত ও তরিকতের বিধান সমূহকে লালন করে নিজের আত্মার ও সত্তার পরিশুদ্ধতার জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে।
০২. শরীয়তের বিধান পরিপূর্ণভাবে পালন করলে তার জন্য এ পৃথিবী ধরাধাম মানে আমাদের হায়াতে জিন্দেগি পরিচ্ছন্ন করা যাবে।
০৩. আজ নৈতিকতার অবক্ষয় আমাদের সমাজে পরিলক্ষিত হচ্ছে এ অনৈতিকতা থেকে রক্ষা পাওয়ার একটাই উপায়‌ সেটা হলো ইসলামকে ইসলামের মর্মসহ উপলব্ধি করে নিজের জীবনে প্রতিফলন ঘটানো।
০৪. যদি প্রেম করতে ভুলে যাও আল্লাহ ও রাসুল (দঃ) এর সেই অনুগ্রহ প্রাপ্ত ব্যক্তিদের সাথে। তাহলে তোমার আখেরাত টলমল হয়ে যাবে।
০৫. ইশকের মাধ্যমে গাউসুল আজম (কঃ)’কে স্মরণ করতে হবে।
ওফাত শরীফ : আহলে বায়তে রাসুল (দঃ) হজরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) এর শাহাদাতের মাস পবিত্র মহররম মাসে ২৭ তারিখ (২৩ জুলাই ২০২৫ বুধবার) মওলায়ে হাকিকী আল্লাহ তা’য়ালা সাক্ষাতে পার্থিব জীবন থেকে অনন্ত জীবনে পদার্পণ করেন তাঁরই বংশের অনন্য ব্যক্তিত্ব হজরত শাহসুফী ডাঃ সৈয়দ দিদারুল হক মাইজভান্ডারী (কঃ)। হুজুর গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী (কঃ) এর ওফাতপ্রাপ্তির তারিখ ২৭ জিলকদ, তাই একই ২৭ তারিখে উনার প্রস্থান প্রমাণ করে যে তিনি গাউসে পাকের (কঃ)’র নিকট কতই না মকবুল ছিলেন।
Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here