সৈয়দ জামিল আহমেদ

১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় মুসলিম বিজয় সূচনার পর প্রায় দেড় শতাব্দী এই অঞ্চল সংঘাত ও অস্থিরতায় বিক্ষুব্ধ ছিল। ফলে মুসলিম শাসকদের পক্ষে পরিবেশন শিল্পের (পারফরমিং আর্টস) ক্ষেত্রে কোনো জোরালো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু ১৩৫২ খ্রিষ্টাব্দে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহর উত্থান এবং দিল্লির সালতানাত থেকে বাংলার স্বাধীনতা অর্জনের ফলে ক্রমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসে, যা কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসারে সহায়ক হয়। এর ফলে বাংলা সমৃদ্ধ ও প্রাচুর্যময় জনপদে পরিণত হয়।

এই বাংলাতেই গৌড়ের তৎকালীন শাসক সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহর (১৩৮৯-১৪১০) অনুপ্রেরণায় শাহ মুহম্মদ সগীর ইউসুফ-জোলেখা নামে কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। এর মূল বার্তা ছিল: আল্লাহ ও তাঁর আদেশের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই জোলেখার মতো মানবিক আবেগ ইউসুফের রূপক ধরে ঐশ্বরিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মিলনের পূর্ণতা পেতে পারে। পবিত্র কোরআনের ওপর ভিত্তি করে (সুরা ইউসুফ: ১২) রচিত এই আখ্যান মধ্যযুগের বাংলায় কট্টর বা গোঁড়া ইসলামি ধারা এবং বিপরীতধর্মী সুফি ধারার মধ্যকার দ্বন্দ্বে ছিল সুফিবাদ–অভিমুখী। সুফি সাধকদের কাছে জোলেখা ছিলেন ‘নিছক এক পাগলপারা প্রেমিকা’; কিন্তু ইসলামের রক্ষণশীল কর্তৃপক্ষের দ্বারা তিনি বারবার ‘তিরস্কৃত, নিন্দিত ও খলনায়িকা’ হিসেবে চিত্রিত হয়েছেন। কোরআনের বাহ্যিক (জাহির) ব্যাখ্যার বিপরীতে সুফিরা এর গূঢ় বা আধ্যাত্মিক (বাতিন) ব্যাখ্যার ওপর জোর দেন।

ইউসুফ-জোলেখা কাব্যটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর অনেকগুলো অধ্যায়ের শুরুতে নির্দিষ্ট রাগ ও তালের উল্লেখ রয়েছে। এগুলো নির্দেশ করে যে কাব্যটি বাদ্যযন্ত্রের সহযোগে গাওয়ার উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল। এ ছাড়া এতে অভিজাত মহলে বারবনিতাদের নাচের আসর আয়োজনের বহু উল্লেখ পাওয়া যায়। এ কাব্যের কিছু অধ্যায় অংশত বর্ণনামূলক পদ্য ও অংশত গীতিনাট্যের (অপেরা) গানের কথা ও সংলাপ (লিব্রেটো) হিসেবে রচিত। দ্বিতীয়ত, এই কাব্য রচনার কিছুকাল পরে বিখ্যাত চীনা কূটনীতিক মা হুয়ানের দেওয়া সাহিত্যিক বিবরণ থেকে জানা যায়, বাংলায় বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণির মধ্যে গান ও নাচে দক্ষ একটি গোষ্ঠী ছিল, যাদের অভিজাতরা প্রায়ই ভোজসভা প্রাণবন্ত করতে আমন্ত্রণ জানাতেন।

১৫২০ খ্রিষ্টাব্দে হুয়াং সিং-ৎসেং সংকলিত বাংলার চীনা মিশনগুলোর অন্য এক নথিতে আরও দেখা যায়, বাংলার মানুষ যখন ‘আনুষ্ঠানিক ভোজসভায় অতিথি নিমন্ত্রণ করতেন, তখন আমোদ-প্রমোদের জন্য অভিনেত্রী ও নর্তকীদের গান ও নাচের ব্যবস্থা থাকত।’ তৃতীয়ত, ১২০০ খ্রিষ্টাব্দে (পূর্ববর্তী হিন্দু সেন রাজবংশের আমলে) রচিত গীতগোবিন্দ-এর সঙ্গে ইউসুফ-জোলেখারকিছু সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। গীতগোবিন্দ-এরও প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে রাগ ও তালের উল্লেখ রয়েছে; এটিও আংশিকভাবে গীতিনাট্যের লিব্রেটো ও আংশিকভাবে ‘গায়ককে শনাক্তকারী বা প্রেক্ষাপট বর্ণনাকারী পদ্য’ হিসেবে রচিত। ভারতের ওডিশায় মনে করা হয় এবং পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের প্রবেশদ্বারে ১৪৯৯ খ্রিষ্টাব্দের একটি শিলালিপি নিশ্চিত করে যে সেখানে সাত শ বছরের বেশি সময় ধরে প্রতি রাতে গীতগোবিন্দ পরিবেশন করা হতো। ওড়িশি শাস্ত্রীয় নৃত্যেরও একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হলো এই গীতগোবিন্দ।

এই তিন ধরনের প্রমাণ একত্র করলে মনে হয়, বাংলার মুসলিম সুলতানদের দরবার গীতগোবিন্দ-এর পরিবেশনাশৈলীটি গ্রহণ করেছিল। কাব্য, সংগীত ও নৃত্যের সমন্বয়ে একটি নতুন রূপকধর্মী আধেয় তৈরি করা হয়েছিল, যা মুসলিম শাসকদের বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। এটি ছিল অনেকটা মোগল ও উত্তর ভারতীয় মুসলিম সামন্ত প্রভুদের গৃহীত প্রক্রিয়ার মতো, যার মাধ্যমে রাধা ও কৃষ্ণের ঐশ্বরিক প্রেমকাহিনির মূল ভাবের ওপর ভিত্তি করে একটি পরিবেশনারীতি আত্মস্থ করে আজকের পরিচিত ‘কত্থক’ নৃত্যের রূপ দেওয়া হয়েছিল।

ইউসুফ-জোলেখা সম্ভবত গান ও নাচের (নাট্যগীত) মাধ্যমে উপস্থাপিত হতো। এতে একদল নর্তক-নর্তকী চরিত্র হিসেবে অভিনয়ের মাধ্যমে কাহিনি ফুটিয়ে তুলতেন, তাঁদের সঙ্গে গায়কেরা কাহিনি বর্ণনা করতেন এবং যন্ত্রীরা তাল ও সংগীত দিতেন। কাব্যের যে অংশগুলো গীতিনাট্যের লিব্রেটো হিসেবে রচিত, সেগুলো সম্ভবত যন্ত্রসংগীতের সহযোগে চরিত্ররূপী নর্তকদের কণ্ঠে গান হিসেবে পরিবেশিত হতো। এই নর্তকেরা ছিলেন সেই ‘দেবদাসী’ শ্রেণির প্রতিনিধি, যাঁদের সম্পর্কে দ্বাদশ শতাব্দীর সেন রাজবংশের সমসাময়িক বা পরবর্তী সাহিত্যে, বিশেষ করে সেকশুভোদয়ায় প্রায়ই শোনা যায়।

শাহ মুহম্মদ সগীরের ইউসুফ-জোলেখা যদি স্রষ্টার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সুফি দর্শনের একটি প্রচ্ছন্ন ব্যাখ্যা হয়, তবে বাহরাম খানের লাইলি-মজনু স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে সেই একই পথ অনুসরণ করেছে। কারণ, লাইলি-মজনু মুসলিমদের কাছে স্রষ্টার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের একটি মৌলিক আদর্শ হিসেবে বিশ্বজনীনভাবে স্বীকৃত। পাশ্চাত্যে এটি ‘প্রাচ্যের রোমিও-জুলিয়েট’ হিসেবে জনপ্রিয়। এর কাহিনিতে লাইলি ও কায়েসের কিংবদন্তিতুল্য প্রেমের বর্ণনা রয়েছে, তাঁরা ভালোবাসার জন্য অসংখ্য প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন; এমনকি কায়েস তাঁর প্রেয়সীর চিন্তায় এতটাই বিভোর থাকেন যে তাঁর নাম হয়ে যায় মজনু (পাগল)। কাহিনি শেষ হয় দুজনেরই হৃদয়বিদারক মৃত্যুতে। প্রাগাধুনিক ও আধুনিক যুগে বাংলাসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এই কাহিনির অসংখ্য সংস্করণ রচিত হয়েছে। বাংলায় বাহরাম খান ১৫৪৩ থেকে ১৫৫৩ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে লাইলি-মজনু রচনা করেন।

মধ্যযুগের বাংলার মুসলিম অভিজাতরা পনেরো শতকে এভাবেই এক গীত-নৃত্য পরিবেশনা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন: তাঁরা পূর্ববর্তী একটি ঐতিহ্য আত্মস্থ করে স্রষ্টার (মাশুক, ‘প্রিয়তম’) প্রতি সৃষ্টির (আশেক, ‘প্রেমিক’) সুফি প্রেমতত্ত্ব (ইশক্) উপস্থাপনের একটি মাধ্যম তৈরি করেছিলেন। প্রতীয়মান হয় যে, পর্যালোচিত সময়ে উদীয়মান মুসলিম সমাজের ইসলামি পরিচিতি অর্জনের ক্ষেত্রে হিন্দুদের পূর্ববর্তী প্রতীক ব্যবস্থার বিপরীতে একটি নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন ছিল। সুফি প্রেমতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গীত-নৃত্য পরিবেশনা উদ্ভাবনের মাধ্যমে মুসলিম অভিজাতরা রাধা-কৃষ্ণের কাহিনির মাধ্যমে প্রকাশিত অস্তিত্বের ধারণা প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন। প্রথমে তাঁরা ইউসুফ-জোলেখার মতো কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ ‘নিষিদ্ধ’ সম্পর্কের ইসলামি কাহিনির আশ্রয় নেন; পরবর্তী সময়ে লাইলি-মজনুর মতো সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এক ‘উন্মত্ত’ আবেগের ইসলামি আখ্যান বেছে নেন।

১৫৭৫ সালে সম্রাট আকবরের বাংলা আক্রমণ এবং শতাব্দীর শেষভাগে এ অঞ্চল সম্পূর্ণভাবে দখলের পর এটি মোগল সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। ফলে বাংলা সাহিত্যকর্মগুলো রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা হারায়। তার প্রভাব পড়ে সুলতানি আমলের সেই গীত-নৃত্য পরিবেশনার ওপর, যা শেষ পর্যন্ত বারবনিতাদের কেবল কামজ নৃত্যে পর্যবসিত হয়। এর ফলে বাংলার স্বাধীন সুলতানদের সেই গীত-নৃত্যশৈলী বিলুপ্ত হয়। বর্তমানে এর রেশ কেবল মাঝেমধ্যে পুঁথি পাঠ অনুষ্ঠানে দেখা যায়, যেখানে শ্রোতাদের উপস্থিতিতে এক ব্যক্তি সুরেলা ছন্দে পাঠ করেন।

বাংলার ইসলামি শিল্প-পরিবেশনার ভবিষ্যৎ গতিপথ এক ব্যতিক্রমী ঘটনার দ্বারা আরও প্রভাবিত হয়; তা হলো পূর্ববঙ্গের কৃষক সম্প্রদায়ের উত্থান। এই অঞ্চলে কৃষিকাজ ও জনসংখ্যার অভূতপূর্ব বিস্তারে উৎসাহিত হয়ে সতেরো ও আঠারো শতকের মধ্যে কৃষকেরা আরব বিশ্বের ইসলামি প্রতীক ব্যবস্থাকে অনন্যভাবে তাদের কৃষিভিত্তিক বিশ্ববীক্ষার সঙ্গে আত্মস্থ করে নেন। এটি তাঁদের অস্তিত্বের সাধারণ শৃঙ্খলা–সম্পর্কিত ধারণার এক স্বতন্ত্র ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এভাবে কৃষকেরাই গাঙ্গেয় বদ্বীপে ‘ইসলামি সভ্যতার প্রধান বাহক’ হিসেবে আবির্ভূত হন। পীরদের ধারণাটি এই শ্রেণির সঙ্গেই অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে।

পীরদের তাৎপর্য কেবল তাঁদের ‘পবিত্র ব্যক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে নয়, বরং এমন ‘মহাপুরুষ’ হিসেবে বোঝা দরকার, ‘যাঁদের জীবন ধর্ম ও কৃষি উভয়েরই বিস্তারের রূপক’ হিসেবে কাজ করেছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ, যেমন শাহ জালাল উদ্দিন তাবরিজি, শাহ জালাল মুজাররাদ এবং খান জাহান আলী রূপকভাবে ইসলামকে প্রান্তিক অঞ্চলের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। অন্য পীরেরা তৃণমূল পর্যায়ে কৃষক সমাজ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পেশাজীবী শ্রেণির অস্তিত্বের ধারণা, জীবনসংগ্রাম ও সংস্কৃতির কাঠামো তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। এই পরবর্তী গোষ্ঠীভুক্ত পীরদের কেন্দ্র করেই কৃষকসমাজ তাদের অলৌকিক ক্ষমতা প্রচারের লক্ষ্যে এক অসাধারণ আখ্যান-সম্ভার গড়ে তুলেছিল এবং তাদের মাহাত্ম্য কীর্তনে বিভিন্ন পরিবেশনা পদ্ধতি সচল হয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে এই পীরদের মধ্যে যাঁদের স্মরণে এখনো বিভিন্ন লোক-পরিবেশনা প্রচলিত, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য গাজী পীর, মাদার পীর, খোয়াজ খিজির, সত্য পীর, মানিক পীর, সোনা পীর, এক–দিল শাহ, গোরাচাঁদ শাহ, মা মাই চম্পা এবং বন বিবি। শেষোক্ত দুজন কিংবদন্তিতুল্য নারী চরিত্র ছাড়া সবাই অসাধারণ পুরুষ চরিত্র।

ওপরে উল্লিখিত ব্যক্তিদের মধ্যে কেবল মাদার পীর একজন সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর নাম সৈয়দ বদিউদ্দিন জিন্দা শাহ মাদার (মৃত্যু: ১৪৩৪ খ্রিষ্টাব্দ)। তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় ‘মাদারিয়া’ নামক একটি জনপ্রিয় সুফি তরিকা বা মতবাদের প্রবর্তন করেছিলেন বলে জানা যায়। গাজী পীর হিন্দু রাজন্যবর্গের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শহীদ হওয়া মুসলিম বীরদের (উত্তরবঙ্গের ইসমাইল খান গাজী এবং দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গের জাফর খান গাজী) স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে লোকমানসের কল্পনায় তৈরি এক পৌরাণিক চরিত্র। গোরাচাঁদ শাহ ও এক-দিল শাহও একই প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েছিলেন। মা মাই চম্পা পৌরাণিক চরিত্র, যাঁকে পীর গাজীর স্ত্রী বলে বিশ্বাস করা হয়। খোয়াজ খিজির হলেন বিশ্বজনীন ইসলামি চেতনার ‘আল্লাহর এক নেককার বান্দা’র স্থানীয় পৌরাণিক রূপ। সত্য পীর, মানিক পীর, সোনা পীর এবং বন বিবিও পৌরাণিক চরিত্র। তবে তাঁদের নামের মধ্য দিয়ে এক কৌতূহলী বৈসাদৃশ্য ফুটে ওঠে: তাঁদের প্রত্যেকের নামের সঙ্গেই মুসলিম ‘পীর’ উপাধির পাশে বাঙালি ছদ্মনাম যুক্ত রয়েছে। এই পীরেরা মূলত রিচার্ড ইটন-বর্ণিত সেই ‘একাত্মকরণ প্রক্রিয়া’র মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছেন, যার ফলে ইসলামি অতিপ্রাকৃত সত্তাগুলো প্রকৃতপক্ষেই স্থানীয় বাঙালি সত্তাগুলোর সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে।

একাত্মকরণের এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সতেরো শতক থেকে বাঙালি মুসলিম কৃষিজীবী সমাজ স্বতন্ত্র পরিবেশনারীতি উদ্ভাবন করতে শুরু করে। তারা হিন্দু দেব-দেবীর স্তুতিমূলক পরিবেশনাশৈলী গ্রহণ করে সেখানে পীরদের মাহাত্ম্য প্রচারকারী নিজস্ব আখ্যানগুলো প্রতিস্থাপন করে।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ নাগাদ বাংলার মুসলিম কৃষক সমাজ পীরদের মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য ভিন্ন ঘরানার এক বিশেষ পরিবেশনারীতি উদ্ভাবন শুরু করে। নামের শেষে ‘যাত্রা’ যুক্ত এবং বর্তমানেও বাংলাদেশে ‘গাজীর যাত্রা’ (‘গাজী পীরের যাত্রা’) ও ‘মানিক পীরের যাত্রা’ হিসেবে প্রচলিত এই পরিবেশনাগুলো সংলাপনির্ভর রচনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই পরিবেশনাগুলোর উত্থানপ্রক্রিয়াও গড়ে উঠেছিল ‘কৃষ্ণযাত্রা’ (কৃষ্ণলীলাভিত্তিক যাত্রা) নামক অত্যন্ত জনপ্রিয় বৈষ্ণব পরিবেশনারীতি আত্মস্থ করার মধ্য দিয়ে।

পীরদের অলৌকিক মাহাত্ম্য প্রচারকারী প্রতিটি অনুষ্ঠানই অবধারিতভাবে প্রথাগত ইসলামি ধারার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল, যার মধ্যে ১৮১৮ সালে হাজি শরীয়তউল্লাহর নেতৃত্বে ফরায়েজি আন্দোলনের উত্থান ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এই আন্দোলন হানাফি মাজহাবের ব্যাখ্যা অনুযায়ী বিশ্বাসের চারটি মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে কঠোর সুন্নি ইসলামি রীতিনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল এবং মূল মতবাদ থেকে বিচ্যুতিকে ‘শিরক’ (অংশীবাদ) ও ‘বিদআত’ (পাপপূর্ণ উদ্ভাবন) হিসেবে নিন্দা করেছিল। ফলে পীরদের অলৌকিক কাহিনিভিত্তিক অনেক পরিবেশনা চরম সংকটের মুখে পড়ে, এমনকি কোনো কোনোটি বিলুপ্তও হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও উনিশ শতকের শেষ চতুর্থাংশে ফরায়েজি আন্দোলন স্তিমিত হতে শুরু করলে পীর-মাহাত্ম্য প্রচারকারী অনুষ্ঠানগুলো পুনরায় প্রাণশক্তি নিয়ে ফিরে আসে।

বিশ শতকের শেষ থেকে এই পরিবেশনাগুলো ওহাবি মতাদর্শী রক্ষণশীল ইসলামপন্থীদের চরম অসহিষ্ণুতার আরেকটি ঢেউ মোকাবিলা করছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্বায়নের প্রসার এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির আগ্রাসনে এই সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনায় আলোচিত সব পরিবেশনা আজ দর্শক-চাহিদার ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে পারে এবং অবধারিতভাবে বিলুপ্ত হতে পারে অথবা সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো পরিবেশনাশৈলীতে রূপান্তরিত হতে পারে।

সংক্ষেপিত: পুরো লেখাটি পড়ুন প্রথম আলো অনলাইনে

অনুবাদ: হাসান ইমাম

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here