আলোকিত বোয়ালখালী ডেস্ক
রমেশ শীলের শেষকৃত্য নিয়ে ছড়ানো মিথ্যার জবাব: সত্য ইতিহাস জানুন

রুপাল শীল
ইতিহাসের বিকৃতি বনাম সত্য:
লোককবি রমেশ শীলের দীক্ষা, সাধনা, সমাধি ও বংশধরদের ঐতিহ্য। ​বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যেখানে সত্য সহজে মানুষের কাছে পৌঁছানোর কথা, সেখানে অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে কিছু অসাধু, অজ্ঞ ও সস্তা জনপ্রিয়তা-লোভী মানুষ ইতিহাসকে বিকৃতির খেলায় মেতে উঠেছে। বাঙালির লোকায়ত দর্শনের বাতিঘর, অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক এবং কবিগানের মহান সম্রাট কবিয়াল রমেশ শীলকে নিয়ে ইদানীং কিছু কাল্পনিক গালগল্প ও মনগড়া কাহিনী ছড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন ধর্মীয় সভা বা ওয়াজ মাহফিলে তাঁর শেষকৃত্য নিয়ে যেভাবে তথ্যপ্রমাণহীন, রসালো গল্প বয়ান করা হয়—তা কেবল মিথ্যাই নয়, বরং একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মহাপুরুষের স্মৃতির প্রতি চরম অবমাননা। রমেশ শীলের রক্ত ও আদর্শের সত্যিকারের উত্তরাধিকারী এবং প্রকৃত ইতিহাস সন্ধানীদের পক্ষ থেকে সেই সত্য ও শুদ্ধ ইতিহাস আজ বিশদভাবে তুলে ধরা হলো, যাতে যুগের পর যুগ মানুষ সঠিক সত্য জানতে পারে।
​১. প্রথম দীক্ষাগুরু: স্বামী জগদানন্দ পুরী মহারাজ ও সনাতন সাধনা
​কবিয়াল রমেশ শীলের আধ্যাত্মিক জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল সনাতন ধর্মের উচ্চমার্গের সাধক ধারার মধ্য দিয়ে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে অন্তরের শিক্ষার সন্ধানে তিনি মগ্ন ছিলেন। তাঁর জীবনের প্রথম এবং প্রধান দীক্ষাগুরু ছিলেন বোয়ালখালীর কধুরখীল (আকুবদণ্ডী) এলাকার প্রখ্যাত ও পরম শ্রদ্ধেয় সাধক স্বামী জগদানন্দ পুরী মহারাজ।
​রমেশ শীল এই মহান সাধকের আধ্যাত্মিক গভীরতা, শাস্ত্রীয় পাণ্ডিত্য এবং লৌকিক জীবনদর্শনে গভীরভাবে মুগ্ধ হয়ে তাঁর চরণে সনাতন ধর্মের প্রথাগত দীক্ষা ও মূল মন্ত্র লাভ করেন। স্বামী জগদানন্দ পুরী মহারাজের এই উদার দীক্ষাই তরুণ রমেশ শীলের মনের সংকীর্ণতা দূর করে দিয়েছিল। তিনি শিখিয়েছিলেন যে, বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে মনের ভেতরের পরমাত্মা বা মানুষকে জাগানোই ধর্মের মূল কথা। এই দীক্ষার ফলেই রমেশ শীল কবিগানের আসরে পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত ও গীতার গূঢ় তত্ত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সাথে উপস্থাপন করতে পারতেন এবং গানের শুরুতে সর্বদা গুরুবন্দনা গাইতেন।
​২. সরদা বাবুর সান্নিধ্য ও মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে ঐতিহাসিক যাত্রা
​কধুরখীলের শ্রীগুরু জগদানন্দ পুরী মহারাজের মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়ার পর রমেশ শীলের অন্তরের আধ্যাত্মিক ক্ষুধা যেন আরও তীব্র রূপ নেয়। তিনি কেবল একটি গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাননি। ঠিক এই সময়ে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তনটি আসে। অনেকে মনে করেন এই যাত্রার পেছনের মানুষটি অন্য এলাকার, কিন্তু আসল সত্য হলো—তিনি ছিলেন রমেশ শীলের নিজস্ব এলাকা বোয়ালখালীর গোমদণ্ডীরই পরম সুহৃদ ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব সরদা চরণ বাবু (যিনি সবার কাছে সরদা বাবু নামে পরিচিত ছিলেন)।
​এই সরদা বাবুর হাত ধরেই নিজের এলাকার মানুষের সাথে রমেশ শীল প্রথমবার চট্টগ্রামের বিখ্যাত সুফি সাধনার কেন্দ্র মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে যাতায়াত শুরু করেন। গোমদণ্ডীর এই দুই আধ্যাত্মিক সত্যান্বেষী মানুষের মেলবন্ধনই বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল।
​৩. বাবা ভাণ্ডারীর অলৌকিকতা, স্নেহ ও সুফি দর্শনে দীক্ষা
​মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে এসে রমেশ শীল দর্শন পান গাউসুল আজম হযরত মাওলানা শাহ্ সূফী সৈয়দ গোলাম রহমান মাইজভাণ্ডারী (কঃ)—যাঁকে লাখো আশেকান পরম ভালোবাসায় ও ভক্তিতে ‘বাবা ভাণ্ডারী’ বলে ডাকেন। বাবা ভাণ্ডারীর জলালতি শান, ঐশী আকর্ষণ এবং অলৌকিক আধ্যাত্মিক ক্ষমতা দেখে রমেশ শীল সম্পূর্ণ বিমোহিত ও আত্মহারা হয়ে যান।
​অন্যদিকে, অন্তর্যামী বাবা ভাণ্ডারীও তরুণ কবিয়াল রমেশ শীলের ভেতরের তীব্র ব্যাকুলতা, অকৃত্রিম ভক্তি এবং একনিষ্ঠ সাধকের মনটি চিনে নিতে ভুল করেননি। তিনি পরম স্নেহে এই ছোট্ট রমেশ শীলকে কাছে টেনে নেন এবং তাঁর মাথায় হাত রেখে বিশেষ দোয়া ও আশীর্বাদ করেন। বাবা ভাণ্ডারীর এই স্বর্গীয় স্নেহধন্য হওয়ার পরই রমেশ শীল আনুষ্ঠানিকভাবে মাইজভাণ্ডারী সুফি দর্শনে দীক্ষিত হন। একাধারে জগদানন্দ পুরী মহারাজের সনাতন উদার শিক্ষা এবং অন্যধারে বাবা ভাণ্ডারীর সুফি করুণা—এই দুইয়ের মহামিলনেই রমেশ শীল হয়ে উঠেছিলেন জগতের ‘মহাত্মা রমেশ শীল’।
​৪. মাইজভাণ্ডারী গানের অবিনাশী জোয়ার
​বাবা ভাণ্ডারীর চরণে আধ্যাত্মিক আত্মসমর্পণের পর রমেশ শীলের ভেতরের কাব্যশক্তি এক অলৌকিক রূপ ধারণ করে। তাঁর লেখনী থেকে সুফি তত্ত্বের ফল্গুধারা ছুটে আসে। তিনি তাঁর জীবনে সাড়ে তিনশোরও বেশি উচ্চাঙ্গের মাইজভাণ্ডারী গান রচনা করেন। প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা না থাকলেও সুফিবাদের অত্যন্ত কঠিন তত্ত্ব যেমন “ফানা ফিল্লাহ” (আল্লাহতে বিলীন হওয়া) বা “বাকা বিল্লাহ”র মতো বিষয়গুলোকে তিনি গ্রামীণ মানুষের সহজ ও সাবলীল ভাষায় রূপ দেন।
​”গাউসুল আজম বাবা ভাণ্ডারী, আমায় পার কর পারের কাণ্ডারী”
কিংবা
“চলরে মন মাইজভাণ্ডারে চল, দেখবি যদি নূরের ঝলমল”
​এরকম অসংখ্য কালজয়ী গান আজও দরবার শরীফের ওরশ, মাহফিল ও আশেকানদের হৃদয়কে যেভাবে আলোড়িত ও উজ্জীবিত করে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তিনি তাঁর গানে রাধাকৃষ্ণের প্রেম আর সুফি প্রেমকে এক করে গেয়েছিলেন:
​”একই বাগে ফুটেছে রে হরেক রঙের ফুল,
কেউ বলে আল্লা-রসুল কেউ বলে গোকুল।”
​৫. অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও সমাধি নিয়ে ছড়ানো মিথ্যার অসারতা
​আজকাল কিছু স্বার্থান্বেষী বক্তা অবৈজ্ঞানিক ও সম্পূর্ণ বানোয়াট গল্প ছড়ায় যে—১৯৬৭ সালে রমেশ শীলের মৃত্যুর পর তাঁর দেহ দাহ করা হবে নাকি দাফন/সমাধি করা হবে, এই নিয়ে নাকি হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ লেগেছিল! এটি একটি ডাহা মিথ্যা এবং সমাজকে বিভ্রান্ত করার অপকৌশল।
​আসল এবং ঐতিহাসিক সত্যটি হলো: কবিয়াল রমেশ শীল জীবিত থাকাকালীনই তাঁর প্রথম দীক্ষাগুরু স্বামী জগদানন্দ পুরী মহারাজ স্বয়ং নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। গুরু ও শিষ্যের আধ্যাত্মিক সমন্বয়, উচ্চতর সাধনার দর্শন এবং সনাতন ধর্মের মহান ঋষি ধারার নিয়ম অনুযায়ী গুরু আদেশ দিয়েছিলেন যে, মৃত্যুর পর রমেশ শীলকে যেন ‘সমাধি’ (ভূ-সমাধি) দেওয়া হয়। সনাতন বা হিন্দু ধর্মে সাধারণ মানুষের দেহ দাহ করার নিয়ম থাকলেও, উচ্চমার্গের সাধক, অবধূত বা দীক্ষিত মহান পুরুষদের ক্ষেত্রে ‘মহানির্বাণ সমাধি’ দেওয়ার বিধান অত্যন্ত প্রাচীন, শাস্ত্রসম্মত এবং পবিত্র।
​গুরুর এই অলঙ্ঘনীয় আদেশের প্রতি পরম শ্রদ্ধা রেখে এবং রমেশ শীলের নিজের অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের ৬ এপ্রিল তাঁর মহাপ্রয়াণের পর বোয়ালখালীর গোমদণ্ডীতে তাঁর নিজ বাড়ির আঙিনায় অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে তাঁকে সমাধি দেওয়া হয়। সেখানে কোনো প্রকার সাম্প্রদায়িক বিরোধ বা ঝামেলার অস্তিত্বই ছিল না।
​৬. বংশধরদের ঐতিহ্য ও শ্রদ্ধার ধারা
​আজকের দিনে আমরা যারা কবিয়াল রমেশ শীলের প্রত্যক্ষ বংশধর আছি, তারা আমাদের পূর্বপুরুষের সেই মহান আদর্শ, শ্রীগুরুর আদেশ এবং রমেশ শীলের সমাধি করার পবিত্র নিয়মের প্রতি শতভাগ সম্মান রেখে এই প্রথাকে আজও সগৌরবে চালু রেখেছি। বংশানুক্রমিকভাবে আমাদের পরিবারে এই প্রথা রক্ষা করে চলাই প্রমাণ করে যে, বাইরে ছড়ানো গল্পগুলো কতটা সস্তা এবং ভিত্তিহীন।
​আমরা অত্যন্ত গর্বের সাথে আমাদের পূর্বপুরুষের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করে আসছি। রমেশ শীলের সমাধি আজ কোনো সাধারণ কবর বা চিতা নয়, এটি বিশ্বমানবতার এক পবিত্র স্মৃতিতীর্থ, যা গুরুর আদেশ এবং শিষ্যের পরম আধ্যাত্মিক সাধনার এক জীবন্ত নিদর্শন।
​উপসংহার:
রমেশ শীল সারা জীবন গেয়ে গেছেন—”মাটির মূর্তির পূজা ছেড়ে মানুষ পূজা কর।” তিনি ছিলেন মানুষের কবি। আসুন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সব জায়গায় আমরা এই সঠিক ও শুদ্ধ ইতিহাসটি প্রচার করি। সস্তা ও রসালো গালগল্প বর্জন করে কবিয়ালের প্রকৃত দর্শন ও সত্য ইতিহাসকে বুকে ধারণ করি,
“…আসুন, সস্তা ও রসালো গালগল্প বর্জন করে আমরা কবিয়ালের এই সত্য ইতিহাস ও প্রকৃত দর্শনকে বুকে ধারণ করি, যাতে আমাদের আগামী প্রজন্ম বিভ্রান্তির হাত থেকে রক্ষা পায়।
 লেখক- রুপাল শীল (লোককবি রমেশ শীলের নাতি)
Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here