আবদুল জব্বার মিয়ার পরিচিতি :
আবদুল জব্বার, যিনি “বলি খেলার জব্বার মিয়া” নামে অধিক পরিচিত, বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া “বলি খেলা” বা কুস্তির সঙ্গে স্ফুর্তভাবে জড়িত একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। তিনি মূলত চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত “জব্বারের বলি খেলা” আয়োজনের জন্য বিখ্যাত। এই খেলার ইতিহাস প্রায় শতবর্ষ পুরনো এবং এটি প্রতিবছর বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সময়, চট্টগ্রামের “বৈশাখী মেলা”র অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয়।
জীবনী সংক্ষেপ:
পুরো নাম: আবদুল জব্বার সওদাগর
জন্মস্থান: চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকায় তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত
জন্মকাল: আনুমানিক ১৮৭০ সালের দিকে
মৃত্যু: ১৯৪৫ সালে
পেশা: ব্যবসায়ী (সওদাগর), সমাজসেবক
উল্লেখযোগ্য অবদান: “জব্বারের বলি খেলা” প্রতিষ্ঠা ও নিয়মিত আয়োজন শুরু করে বলি খেলার সূচনা করেন। ১৯০৯ সালে আবদুল জব্বার এই খেলার সূচনা করেন। তার লক্ষ্য ছিল যুবসমাজকে শারীরিকভাবে শক্তিশালী ও আত্মপ্রত্যয়ী করে গড়ে তোলা, এবং উপনিবেশ বিরোধী চেতনায় উজ্জীবিত করা। ব্রিটিশ শাসনের সময়ে জাতীয় চেতনা ও শারীরিক সুস্থতার বার্তা ছড়াতে তিনি এই খেলাটি জনপ্রিয় করে তোলেন।
এই বলি খেলা ছিল শুধু খেলা নয়, একটি মেলা, যেখানে স্থানীয় লোকজন ছাড়াও দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এসে সমবেত হতো। এর মধ্য দিয়ে তিনি এক ধরনের সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। তার মৃত্যুর পরও উত্তরাধিকারা তার নামেই এই খেলা ও মেলা প্রতিবছর আয়োজন করে আসছে – “জব্বারের বলি খেলা” নামে। এটি এখন চট্টগ্রামের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক আয়োজন।

চট্টগ্রামের বক্সিরহাট এলাকায়, আনুমানিক ১৮৭০ সালের দিকে। পেশায় ছিলেন একজন ব্যবসায়ী, তবে শুধু ব্যবসার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। সমাজসেবার প্রতি তার গভীর টান ছিল। শৈশব থেকেই সমাজের প্রতি এক ধরনের দায়বদ্ধতা অনুভব করতেন, যা পরবর্তীতে তার জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্যে রূপ নেয়।

ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের সময় বাঙালিদের মধ্যে জাতীয় চেতনা ধীরে ধীরে জেগে উঠছিল। আবদুল জব্বার বিশ্বাস করতেন, যুবসমাজকে যদি শারীরিক ও মানসিকভাবে সবল করা যায়, তবে তারা জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে সাহসী ভূমিকা রাখতে পারবে। খেলাধুলা ছিল তার কাছে সেই শক্তি ও সাহস তৈরির মাধ্যম।
১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে তিনি শুরু করেন “বলি খেলা”র আয়োজন। “বলি” শব্দটি এসেছে “যোদ্ধা” অর্থে – এটি ছিল এক ধরনের কুস্তি প্রতিযোগিতা। তবে এর পেছনে ছিল গভীর উদ্দেশ্য: যুবকদের মধ্যে শারীরিক সক্ষমতা ও জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলা। খেলাটি স্থানীয়ভাবে শুরু হলেও অল্প সময়েই এর জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
বলি খেলার পাশাপাশি গড়ে ওঠে একটি বিশাল বৈশাখী মেলা – যা আজ পরিচিত “জব্বারের মেলা” নামে। প্রতিবছর ১২ বৈশাখে এই মেলার আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেয় হাজার হাজার মানুষ, আসে দেশীয় হস্তশিল্প, খাবার, পোশাক ও বিনোদনের নানা আয়োজন। এই মেলা হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১৯৪৫ সালে আবদুল জব্বার মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তিনি রেখে যান এমন একটি ঐতিহ্য, যা সময়ের স্রোতেও টিকে আছে। “জব্বারের বলি খেলা” আজও আয়োজন করা হয় তার স্মৃতিকে কেন্দ্র করে। এটি কেবল একটি খেলাই নয়, বরং এটি একটি উৎসব, একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন – যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে।
আবদুল জব্বার সওদাগর ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি খেলাধুলাকে শক্তি ও চেতনার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার সৃষ্ট বলি খেলা আজও চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের অন্যতম গৌরব। এমন মানুষ ও ঐতিহ্যকে সম্মান জানানোই আমাদের দায়িত্ব।
জব্বারের বলি খেলা শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি আমাদের ইতিহাস, আমাদের অহংকার।
Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here