Home স্মরণীয় বরণীয় ‘সুরের আকাশে তুমি যে গো শুকতারা’

‘সুরের আকাশে তুমি যে গো শুকতারা’

জন্ম দিনে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য

197
0
সঙ্গীতে তাঁর উত্থান হয়েছে ধীরে ধীরে। শেষে খ্যাতি পৌঁছেছিল কিংবদন্তীর স্তরে। তিনি ছিলেন সুরের জাদুকর। জন্ম দিনে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।
লেখা ও সাক্ষাৎকার: উজ্জ্বল চক্রবর্তী।
বাবা ভেবেছিলেন, ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে। ছেলে ভেবেছিল, সে হবে সাহিত্যিক। বাবার ইচ্ছেপূরণের জন্য ছেলে ভর্তি হয়েছিল যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। নিজেকে সাহিত্যের বেষ্টনীতে আটকাতে ছেলে শুরু করেছিল লেখালেখির চর্চা। কিন্তু মাঝপথে থমকে গেল দু’জনের ইচ্ছে। ছেলের জীবনে জড়িয়ে গেল গান। দিনে দিনে গানই হয়ে উঠল তার জগৎ, ধ্যান-জ্ঞান-নেশা এবং শেষমেশ পেশাও। বন্ধুবান্ধবের গণ্ডি পেরিয়ে তার গান যখন প্রথম বেতারে ভেসে এল, বাঙালি শুনল মন্ত্রমুগ্ধ এক কণ্ঠ। শুনল একটি নাম। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ভিনভাষীর উচ্চারণে সেই নামই আবার কয়েক বছর পরে সারা ভারত শুনবে হেমন্তকুমার হিসেবে।

তত দিনে তিনি সঙ্গীত জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত এবং জনপ্রিয় করে তুলবেন। হাতা গোটানো সাদা বাংলা শার্ট। সাদা ধুতি। কালো ফ্রেমের চশমা। ব্যাক ব্রাশ করা চুল। নম্র উচ্চারণের আলাপচারিতা। রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে আধুনিক গান। ফিল্মের প্লে ব্যাক থেকে ফাংশনের ম্যারাপ। খাদ থেকে চড়া— সর্বত্র যাতায়াতে অভ্যস্থ দরাজ গলা। ‘ব্র্যান্ড হেমন্ত’র এ সবই ছিল এক একটা ‘আইকনিক’ চিহ্ন।

শুরুর দিনগুলো এলোমেলো হলেও কী ভাবে যেন বিনে সুতোয় গাঁথা হয়ে গিয়েছিল হেমন্তের জীবনে। শুরু থেকেই গান? নাকি গানের জন্য শুরু? অতটা স্পষ্ট ছিল না সে দিনগুলো।

সোনালি মুহূর্ত… রেকর্ডিং-এ কিশোর এবং হেমন্ত।

সলতে পাকানোর শুরুটা মিত্র ইনস্টিটিউশনে পড়ার সময়ে। গান গাওয়ার ‘অপরাধে’ সেখান থেকে তাকে বের করে দেওয়া হয় এক বার। তখন তার দশম শ্রেণি। শেষে অনেক ধরে করে নির্দেশ প্রত্যাহার করা হয়। বেশি মাইনের এই স্কুলে হেমন্তের বাবা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন নিবেদন করে ‘হাফ ফ্রি’ করে ছেলেকে ভর্তি করেছিলেন। তার পরেও যদি ছেলেকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়…
বাবা কালীদাস মুখোপাধ্যায় ছিলেন সামান্য কেরা‌নি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বহুড়া গ্রামে তাঁর পৈতৃক ভিটে। কালীদাসবাবুর শ্বশুরবাড়ি ছিল বারাণসীতে। স্ত্রী কিরণবালাদেবীর বাবা সেখানকার হাসপাতালের সিভিল সার্জেন। কৃতী এবং বেশ নাম করা ডাক্তার। কাজেই সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে বারাণসীতে রাখাই শ্রেয় মনে করতেন কালীদাসবাবু। মুখোপাধ্যায় দম্পতির চার ছেলে এবং এক মেয়ের মধ্যে হেমন্ত ছিলে‌ন দ্বিতীয়। ১৯২০ সালের ১৬ জুন জন্ম তাঁর। এর পর তার ছেলেবেলা কাটে ওই বহুড়াতে। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর কালীদাসবাবু সপরিবার কলকাতায় উঠে আসেন। শহরে হেমন্তদের ঠিকানা হল ২৬/২এ রূপনারায়ণ নন্দন লেন, ভবানীপুর। হেমন্ত প্রথমে ভর্তি হল বাড়ির কাছে নাসিরুদ্দিন মেমোরিয়াল স্কুলে। তার পর মিত্র ইনস্টিটিউশন।

শান্তিদেব ঘোষের সঙ্গে।

স্ত্রী বেলা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে হেমন্ত।

সহপাঠীদের মধ্যে হেমন্তের বন্ধু ছিল সমরেশ রায়, পরিমল সেন, রমাকৃষ্ণ মৈত্র এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায়। রমাকৃষ্ণ তখন গদ্যের চর্চা করছে। সুভাষ কবিতার। হেমন্ত ভিড়ে গেল রমাকৃষ্ণের সঙ্গে। শুরু হল গদ্যের চর্চা। এর মধ্যে আর এক সহপাঠীর সঙ্গে খুবই জমে ওঠে হেমন্তর সম্পর্ক। তার নাম শ্যামসুন্দর। সম্পর্কের অন্যতম কারণ হারমোনিয়ম-তবলা-গ্রামোফোন-রেকর্ড। শ্যাসুন্দরদের বাড়িতে যাতায়াত শুরু হল। রেকর্ডের গান শোনা থেকে হারমোনিয়ম বাজিয়ে সেই গান তোলা— সবই চলতে থাকল ওই বাড়িতে। স্কুলেও চলতে থাকে গানবাজনা। তবে সে সব ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে। বন্ধুদের মধ্যে সুভাষ (যিনি আর কিছু দিনের মধ্যেই বিখ্যাত হবেন কবি হিসেবে) হঠাৎ বন্ধু হেমন্তকে রেডিওতে গাওয়ানোর জন্য উঠেপড়ে লাগল। কারণ আর কিছুই না। বার্ষিক অনুষ্ঠানে স্কুল কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র সমরেশকে দিয়েই গাওয়ায়। অথচ হেমন্ত এত ভাল গাওয়া সত্ত্বেও তাকে মোটেও ডাকা হয় না। বিষয়টা ভাল লাগেনি বন্ধু সুভাষের। ১ নম্বর গার্স্টিন প্লেসে তখন ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের দফতর। পরে এর নাম হয় অল ইন্ডিয়া রেডিও।

অডিশন দিতে হেমন্তকে সঙ্গে নিয়ে এখানে আসার আগে মামার বন্ধুর ছেলে কালোদার সঙ্গে সুভাষকে অনেক আলাপ আলোচনা সারতে হয়েছিল। পরে এই কালোদাই হবে‌ন বাংলা ফিল্মের নায়ক অসিতবরণ। তিনি তখন রেডিওর তবলা শিল্পী। কালোদার ঠিক করে দেওয়া দিনে অডিশন দিল হেমন্ত। তখন তার বয়স বছর ষোলো হবে। সুভাষ পরে লিখেছেন, ‘‘কোনও ভয়ডর নেই। হারমোনিয়ম টেনে বেমক্কা গেয়ে গেল। যেন এ সব ওর কাছে ডালভাত।’’ অডিশনের ফল কী হবে? চিন্তা যেন কেবল সুভাষেরই। হেমন্তের কোনও তাপউত্তাপ নেই। সে আবার লেখা নিয়ে মেতে উঠেছে। সুভাষের কথায়: ‘‘ওর গান হবে কি না জানি না। তবে লেখা যে হবে না, এটা বিলক্ষণ বুঝেছিলাম। যার বুক ধড়ফড়ানি নেই, জ্বলুনিপুড়ুনি নেই— সে আবার কী লেখক হবে!’’ তিন মাস পরে বাড়িতে চিঠি এল। এ বার রেকর্ডিং। সব ঠিকই ছিল, কিন্তু বাবাকে রাজি করানোটাই তার কাছে বড় ব্যাপার। যাই হোক শেষে বাবাকে রাজি করিয়েছিলেন মা কিরণবালাদেবী। কিন্তু রেকর্ডিং-এ গাইবে কী? পরিত্রাতা সেই সুভাষ। হেমন্তের অনুরোধে রাতারাতি লিখে ফেললেন একটি গান। আর একটি গান হেমন্ত শিখলেন পাড়ার নিরাপদ চক্রবর্তীর কাছ থেকে। সেটি ভাটিয়ালি। নির্দিষ্ট দিনে রেডিওতে প্রথম গান গাইল হেমন্ত।

পথ চলার সেই শুরু। এর পরে হেমন্তকে যখনই তাঁর সঙ্গীতজীবন নিয়ে কিছু বলতে বলা হয়েছে, অবধারিত ভাবে তিনি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কথা বলতেন, ‘‘গানের ক্ষেত্রে সুভাষ ছিল আমার বড় সহায়।’’


দুই কিংবদন্তী…

প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাশ করে যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হলেন হেমন্ত। এই সময়ে বাবার বন্ধু শান্তি বসুর মাধ্যমে পরিচয় হল শৈলেশ দত্তগুপ্তের সঙ্গে। তিনি তখন কলম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানির ট্রেনার। গান শুনে হেমন্তের রেকর্ড করালেন শৈলেশবাবু। পনেরো দিনের মধ্যে রেকর্ড বাজারে এল। সেটা ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বর মাস। ব্যস, আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি হেমন্তকে। দু’মাস অন্তর চারটে রেকর্ড আর রেডিওতে পাঁচটা করে প্রোগ্রাম। সব মিলিয়ে মাসের শেষে বেশ কিছু টাকা দেওয়া যেত টানাটানির সংসারে। মায়ের প্রশ্রয় আগেই পেয়েছেন, এ বার বাবাও আস্তে আস্তে সদয় হলেন গান-বাজনার উপর। এর মধ্যেই গান শিখছেন ফৈয়াজ খানের ছাত্র ফণীভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। বছর দেড়েক শেখার পর ফণীবাবুর মৃত্যু হয়। ইঞ্জিনিয়ারিং-এর তৃতীয় বর্ষে উঠেই পড়াশোনাতে ইস্তফা দিলেন হেমন্ত।

গানই হয়ে উঠল তাঁর সর্বসময়ের আধার। করতে শুরু করলেন টিউশনিও।

রবীন্দ্র‌নাথের গান সেই অর্থে কোনও প্রতিষ্ঠানে বা গুরুর কাছে শেখেননি। শৈলেশবাবুর কাছেই প্রথম স্বরলিপি ধরে ধরে তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষা। পঙ্কজকুমার মল্লিকের সঙ্গে মিল খুঁজে পেয়ে অনেকেই তাঁকে ‘ছোট পঙ্কজ’ বলে ডাকতে লাগলেন। এতে তিনি অনুপ্রাণিত হতেন। সঙ্গীতশিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘‘হেমন্তদা আসলে পঙ্কজবাবুর স্টাইল ফলো করতেন। সেটাকে নিজের মতো করে আত্মীকরণ করে পরিবেশন করতেন। আমি যেমন হেমন্তদার স্টাইল অনুসরণ করে গাইতাম, তেমনই।’’

শুরুর দিনগুলো থেকেই হেমন্ত নিরবচ্ছিন্ন ভাবে শুধু কাজ করে গিয়েছেন। আসলে এই সলতে পাকানোর দিনগুলো পেরোতে পেরোতেই হেমন্ত দখল করে নিয়েছিলেন সঙ্গীতপ্রেমী মানুষের মন। এর বাইরে আর ছিল তাঁর ছবির কাজ। ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে বিয়ে করলেন বেলা মুখোপাধ্যায়কে।

চল্লিশের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে প্রথম প্লে ব্যাক করলেন হেমন্ত, ‘নিমাই সন্ন্যাস’ ছবিতে। তার পরে বেশ কিছু ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা। এর মধ্যেই সলিল চৌধুরীর কথায় ও সুরে তিনি পর পর কয়েক বছর রেকর্ড করলেন বেশ কয়েকটি গান, ‘কোনও এক গাঁয়ের বধূ’ থেকে ‘রানার’— বাঙালি অন্য ভাবে পেল এই জুটিকে। একই সময়ে বের হওয়া তাঁর আধুনিক গানের রেকর্ডগুলিও ভীষণ জনপ্রিয় হয়। ১৯৫১-য় বোম্বাই পাড়ি দিলেন হেমন্ত, ‘আনন্দমঠ’ ছবিতে সুর করবেন বলে। হিন্দিভাষীরা পেলেন নতুন এক গায়ক, হেমন্ত্কুমার। তাঁর কণ্ঠে মুগ্ধ তখন প্রায় সারা ভারত। হৈমন্তী শুক্ল জানালেন, শিল্পী মেহেদি হাসানকে এক বার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘আপনি কি কাউকে হিংসা করেন?’ উত্তর এসেছিল, ‘হেমন্তকুমারের আওয়াজ।’

উত্তম-হেমন্ত কাননদেবীর সঙ্গে ইডেন গার্ডেনে।

পঞ্চাশের দশকে সঙ্গীত পরিচালক, সুরকার এবং গায়ক হিসেবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নাম আকাশস্পর্শী। তিনি এ বার নিজেকে নিয়ে এলেন চলচ্চিত্র প্রযোজকের ভূমিকায়। প্রথম বাংলা ছবি মৃণাল সেনের পরিচালনায় ‘নীল আকাশের নীচে’। এর পরে হিন্দিতে করলেন ‘বিশ সাল বাদ’। বেশ কিছু ছবি প্রযোজনা করেন। পাশাপাশি গেয়েছেন অসংখ্য গান। ফিল্মি, আধুনিক, রবীন্দ্রসঙ্গীত— বাঙালি তাঁর গলাতে ছিল সম্মোহিত।

খ্যাতির শিখরে সারা জীবন থেকেও খুব সাদামাটা জীবনযাপন করতেন হেমন্ত। ছিলেন পরোপকারী। অন্যের বিপদে এগিয়ে যেতেন সর্বদা। তখন সদ্য মারা গিয়েছেন গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। তাঁর পরিবারের সাহায্যকল্পে একটি সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় কলকাতায়। উদ্যোক্তারা হেমন্তবাবুকে গান গাইতে আমন্ত্রণ জানালেন। তিনি তখন বোম্বাইতে থাকেন। বিমানভাড়া এবং পারিশ্রমিক দুই-ই দাবি করলেন উদ্যোক্তাদের কাছে। কিন্তু কিন্তু ভাব করে তাঁরা হেমন্তবাবুর প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। অনুষ্ঠানের দিন হেমন্তবাবু মঞ্চে উঠে গৌরীবাবুর স্ত্রীর উদ্দেশে বললেন, ‘‘এইখানে বৌদি আছেন কি?’’ এর পর পারিশ্রমিক এবং বিমানভাড়ার পুরো টাকাটা তাঁর হাতে তুলে দিয়ে হেমন্ত দর্শকদের জানিয়েছিলেন, বহু সাহায্য অনুষ্ঠানের শেষে পঞ্চাশ টাকাও পরিবারের হাতে দেওয়া যায় না। তিনি তাই চেয়েছিলেন ওই টাকাটি অন্তত পরিবারের কাছে পৌঁছক। মনের দিক থেকে এতটাই বড় মাপের ছিলেন তিনি। হেমন্তবাবু সম্পর্কে চলচ্চিত্র পরিচালক তরুণ মজুমদারের মন্তব্য: ‘‘ওঁর সঙ্গে ২৫ ধরে আমার সম্পর্ক ছিল। হেমন্তবাবু সম্পর্কে যত শব্দই বলি বা লিখি না কেন, কম পড়ে যাবে। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নীরব থাকাটাকেই আমি শ্রেয় বলে মনে করি।’’

১৯৮৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ৬৯ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের।

এবি/টিআর
মেইল থেকে পাপ্ত

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here