আলোকিত বোয়ালখালী ডেস্ক
আমার পাড়া হলো পুরোনো চাটগাঁ। কর্ণফুলী নদী পাশে পুরোনো বসতি বিস্তৃত হয়ে গড়ে ওঠা বর্তমান মহানগর। পাড়ায় এখনো শতবর্ষী প্রাচীন বাড়ি রয়েছে। পাড়ার গলিতে হাঁটলে প্রাচীন সময় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলোর সামনে এসে দাঁড়ালে। চট্টগ্রামের অতীত জৌলুস ও দৃষ্টিনন্দন রূপ জাদুকরের থলে হতে হঠাৎ হাজির হয়।
এই সাক্ষাৎ মনকে প্রভাবিত করে। ভীষণভাবে আলোড়িত করে। চোখের সামনে শত শত বছরের অভিজ্ঞতা দর্শন ও স্মৃতির খনি আনন্দের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে হাইরাইজের ঝলকানিতে এইসব হেরিটেজ স্মৃতি আমার পাড়াকে ভিন্ন রূপে প্রকাশ করে।
হেরিটেজ সমৃদ্ধ পাড়ার মতো এইখানের মানুষগুলোও পুরোনো। মানুষগুলো হেরিটেজ বাড়ির মতো পাড়াকেও আঁকড়ে ধরে আছে পরম মমতায়। পাড়ার মানুষগুলো ঘরে ফেরার পর গলিতে পড়ে থাকা ক্লান্ত রাতের পাশে। দোকানীর সাউন্ডবক্সে বাজায় মনির খানের বিচ্ছেদী গানের করুণ সুর। বেবি নাজনীনের রঙ্গিলা কোমল প্রেমের গানে পাড়াময় ছড়িয়ে পড়ে ক্লাসিক ও ভিনতেজ চট্টগ্রামের ভাইভ। আহা!
বারান্দা হতে পুরো পাড়ার হৃদস্পন্দন শুনি ও দেখি। পাড়া ঘিরে চারপাশে আকাশ ছোঁয়া হাইরাইজের পাশে মনে হয় কান্ট্রি সাইড। মনে হয় মফস্বল ল্যান্ডস্কেপে আমি বসবাস করছি। মাঝে মধ্যে অন্ধকার রাত ভেঙ্গে উড়ে যাওয়া বাদুড়ের সাথে জোনাকির সম্মিলন হলে পরিবেশের পরিপূর্ণতা হতো। গলিতে দাঁড়িয়ে লোকজনের গালগল্প হাসিঠাট্টা আর ঝগড়া পাড়ার হৃদয়কে করেছে নব্বই দশকের মেলোড্রামা। এই সুখ এই বিষাদ এই দুঃখের অনলে পোড়া গ্রীষ্মের দুপুরবেলার মতো আর্তনাদের পাশে আছে প্রখর উল্লাস।
পাড়াতে গলিতে সকল বাসিন্দা পরস্পর সম্পর্কিত ও মাখামাখি। চলতি পথে কুশলাদি। মুখ দর্শনের উত্তরে হাসিমুখ। দোকানি ফেরিওয়াল ক্রেতা বিক্রেতা সকল সম্পর্কের মধ্যে স্থির আছে আন্তরিক সৌন্দর্য ও সৌহার্দ্য। চেনা পরিচিত ভাব-গাম্ভীর্য ও রসিকতা। প্রতিদিন চলতি পথে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে দেখা হচ্ছে। কথা হচ্ছে। লেনদেন হচ্ছে। ধীরে ধীরে আলাপ জমে উঠছে। এতে যে সম্পর্ক গ্রো করছে তাতে মানুষগুলোর অগাধ আস্তা। মিলেমিশে সমাজ হয়ে ওঠার অদম্য আগ্রহের দেখা মেলে। এখন মহানগরের অধিকাংশ অঞ্চল আবাসিক এলাকা হয়েছে। অতীতের পাড়া কেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থা নাই হয়ে গিয়েছে। সেই তুলনায় প্রাচীন জনপদের এই পাড়ায় সমাজিক অবয়ব বেশ দৃশ্যমান আছে। সমাজ এখনো স্বগর্বে দৃশ্যমান আছে। আর এই সমাজবদ্ধ মানুষের ভিতর সামাজিক আচরণে পরিবেশ ও পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। অভিযোজন ঘটে মন ও মননে।
বারান্দা হতে পাড়ার বিস্তৃত ল্যান্ডস্কেপ চোখের সামনে হাজির হয়। দূরে হাইরাইজ ঘেরা পাড়াকে পৃথক করে পাড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বিল্ডিং আমাকে নব্বই দশকের দৃশ্যপট উপস্থাপন করে। মনে হয় নব্বই দশকে বসবাস করছি। জীর্ণ বিল্ডিংগুলোর ভিতর মানুষের আনাগোনা সময়কে চঞ্চল করে। নয়ত শ্যাওলা কালিজমা বিল্ডিং দেখে মনে হবে পরিত্যক্ত কোনো জনপদ। কেবল মানুষগুলো পুরো পাড়াকে অন্য রকম ভাইবে হাজির করে।
পাড়ায় নির্দিষ্ট দোকানি ফেরিওয়ালার মতো নির্দিষ্ট ভিক্ষুকও আছে। আছে নির্দিষ্ট কিছু রিকশাওয়ালা। যারা কেবল পাড়ার লোকজনকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার জন্য অপেক্ষা করে। পাড়ার মানুষগুলোর প্রতি তাদের আশ্চর্য মহব্বত। আছে নানাবিধ বৃক্ষরাজি। হাসনুহেনা কামিনীর ঘ্রাণে পাড়ার রাত হয়ে ওঠে গথিক। চড়ুই কবুতর ঘুঘু বুলবুলি আর শালিখের হল্লায় পড়ার বিড়ালগুলো ক্যাটওয়াক করতে করতে থেমে যায়। কুকুরগুলো গলির শেষ মাথা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। ডুবো তেলে ভাঁজা পরোটা আর হালুয়া এবং আগুন গরম সিঙ্গারার গায়ে সরিষা সসের অবসরগুলো রঙ্গিলা চাটগাঁয়ের যাপন হাজির করে। কীর্তনের সুরে। ভান্ডারী ঢোলের ছন্দে। কুরআন এর সুমধুর তিলাওয়াতে। পাড়া জুড়ে বয়ে যায় দূরের বৃষ্টি ভেজা শীতল মোলায়েম হাওয়া। এ হাওয়ায় কান পাতলে দেখা যায় গলিগুপচির আখ্যান।
#ব্যক্তিগত_জার্নাল
০৯.০৪.২৬
মাকতুবখানা, চট্ট-মেট্রো
Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here