রাজন ভট্টাচার্য :

‘আমার জীবনের এই সত্তরের কাছাকাছি বয়সে এসে অপ্রাপ্তি বলে আর কিছু নেই। আমি আমার মায়ের সম্ভ্রমের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি। আমি ভাগ্যবান। আমি সব গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে অংশ নিয়েছি। যখন অসুস্থ ছিলাম, এলাকার মানুষ আমার জন্য কেঁদেছে। আমি এখন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। খালি হাতে এসেছিলাম, খালি হাতেই ফিরে যাবো’। অসুস্থ অবস্থায় গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সদস্য মইন উদ্দীন খান বাদল। বৃহস্পতিবার ভোরে ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে যান ৬৭ বছর বয়সী এই নেতা। দেশপ্রেমিক এই মানুষটির মৃত্যুর পর রাজনীতিবিদ, শুভান্যুধ্যায়ীসহ সাধারণ মানুষের কাছে সমান মর্যাদায় তিনি।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকার ও জনপ্রিয় এই সাংসদের বিদায়ে শোকে মুহ্যমান সবাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেন হয়ে উঠেছে শোকের পাতা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ীরা বলছেন, উগ্রসাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে তিনি সব সময় সোচ্চার ছিলেন। স্বপ্ন দেখতেন ধর্মনিরপেক্ষ সুখী সমৃদ্ধি বাংলাদেশের। এক কথায় প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর ছিলেন এই নেতা।

সন্ত্রাস, মৌলবাদ দমন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করেছেন নিরলসভাবে। কখনও দেশবিরোধী ও অশুভ শক্তির সঙ্গে আপোস করেননি আপাদমস্তক দেশপ্রেমিক এই মানুষটি। সর্বোপরি তিনি নিজ এলাকার উন্নয়ন ও মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন সবার আগে। আঞ্চলিক ভাষা চর্চায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন মাটি মানুষের এই নেতা। সর্বশেষ কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের জন্য দীর্ঘদিন চেষ্টা চালিয়েছেন। সেতু নির্মাণ না হলে সংসদ থেকে পদত্যাগ করারও ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। আজীবন দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা সব সময় নিজেকে জনস্বার্থে নিয়োজিত রেখেছিলেন। পরিচ্ছন্ন ও নিরঅহংকার রাজনীতিক হিসেবেও দেশজুড়ে তার সমান পরিচিতি। ছিলেন সবার কাছে সমান জনপ্রিয়। জাতীয় সংসদে বলিষ্ট কণ্ঠস্বর ও দাবি আদায়ে সোচ্চার থাকতেন তিনি। কখনও ভয় নিয়ে কথা বলতেন না। সত্যের পক্ষ্যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংসদের ভেতরে বাইরে সমান ভূমিকায় ছিলেন।

বাদলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ বলেন, মইন উদ্দীন খান বাদল ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। বাঙালীদের ওপর আক্রমণের জন্য পাকিস্তান থেকে আনা অস্ত্র চট্টগ্রাম বন্দরে সোয়াত জাহাজ থেকে খালাসের সময় প্রতিরোধের অন্যতম নেতৃত্বদাতা ছিলেন প্রয়াত এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আরও বলেন, তাঁর মৃত্যুতে জাতি আজ বিনয়ী অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ, শিক্ষিত ও ত্যাগী রাজনীতিবিদকে হারালো। রাজনৈতিক অঙ্গনে তার মৃত্যুতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো তা সহজে পূরণ হবার নয়।

ধর্মনিরপেক্ষতা না থাকলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব থাকবে না

একজন দেশপ্রেমিক নেতা ছিলেন বাদল। স্বপ্ন দেখতেন একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের। তাই রাজনৈতিক জীবনে সংসদের ভেতরে বাইরে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। ২০১৭ সালের ২৯ অক্টোবর সংসদে দেয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, এটাই হয়তো এই সংসদে আমার শেষ বক্তব্য। তিনি বলেন, …মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশ করব বলে। আজ মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কথা বলবেন, তা হয় না। আমেরিকার পার্লামেন্টে দেশের বিরুদ্ধে কথা বলা কিংবা ব্রিটেনের পার্লামেন্টে রানীর বিরুদ্ধে দাঁড়ালে ছাড় দেয়া হয় না। কেন আমরা …ছাড় দিচ্ছি? …আবার ডাক এসেছে মুক্তিযুদ্ধে যেতে হবে। তিনি বলেন, আমার দেশে বাঙালীরা স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করবে। এখানে সব ধর্মের মানুষের অধিকার সমান। …তাই আমি বারবার বলছি ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব থাকবে না। তিনি বলেন, পুলিশ দিয়ে দুর্গাপূজা বা কঠিন চিবড়দান উৎসব হয় না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন।

সেই সেতু আর দেখে যেতে পারেননি

কালুরঘাটে নতুন সেতুর কাজ শুরু না হলে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে এসেছে সেতু নির্মাণের ঘোষণা। কিন্তু সেই সেতু দেখে যেতে পারলেন না জাসদ নেতা সংসদ সদস্য মইন দ্দীন খান বাদল। সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোক জানানোর পাশাপাশি এই মুক্তিযোদ্ধার শেষ ইচ্ছা পূরণে কালুরঘাট সেতুর নির্মাণকাজ অবিলম্বে শুরুর বিষয়টিও এসেছে। কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আশ্বাস পাওয়ার বিষয়টি গত ৮ অক্টোবর বায়েজিদ সবুজ উদ্যানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন সাংসদ বাদল। এরপর ২৭ অক্টোবর চট্টগ্রামে সড়ক ভবনে এক অনুষ্ঠানে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, কালুরঘাটে পাশাপাশি রেল ও সড়ক দুটি সেতু হবে। ওবায়দুল কাদেরের সেই বক্তব্যের ভিডিও বাদলের ফেসবুক পেজ থেকে শেয়ারও করা হয়। এর ১০ দিনের মাথায় পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন তিনি।

বন্ধুর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, শেষ একটা ইচ্ছা ছিল তার- কালুরঘাট সেতু। তিনিই আমাকে এটার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিয়ে যান। প্রধানমন্ত্রী আমার সামনে বলেছেন- আপনার ব্রিজ আমি করে দেব। ইনশাল্লাহ ব্রিজ হবে। বাদল ব্রিজের জন্