অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, লেখক ও গবেষক। তিনি ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট। তিনি সংবিধান সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান। তবে এ দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়। তার গবেষণা ও প্রকাশনার ক্ষেত্র হচ্ছে গণতন্ত্র, সহিংস উগ্রবাদ, ধর্ম ও রাজনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি। সাম্প্রতিককালে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ, রাষ্ট্র ও সংবিধানের সংস্কার, প্রশাসনের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি প্রভৃতি বিষয় নিয়ে কালবেলার সঙ্গে কথা বলেন

বাংলাদেশের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংস্কার প্রয়োজন। এ সংস্কার কীভাবে হতে পারে বলে মনে করেন?

আলী রীয়াজ: রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি হলো, নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া। দলের নেতৃত্ব উত্তরাধিকার সূত্রে আসবেন নাকি একেবারে প্রান্তিক স্তর থেকে দলীয় নেতাকর্মীদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন নিয়ে কেউ আসবেন, তা নির্ধারণ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রথমে এ নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া ঠিক করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সামগ্রিকভাবে দলের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে আর্থিক বিষয় পর্যন্ত সব কাজে স্বচ্ছতা তৈরি করা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতার বড় অভাব রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো যখন ক্ষমতায় গেছে তখন এটা আরও বড় করে লক্ষ করা গেছে। উদাহরণস্বরূপ, আওয়ামী লীগ যখন রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহাবুদ্দীন সাহেবকে মনোনয়ন দেয়, তখন সেটা কেউ জানত না। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাই সিদ্ধান্ত নেন এবং সবাইকে বিস্মিত করে সাহাবুদ্দীন সাহেবকে মনোনীত করেন।

আমি মনে করি এটি অস্বচ্ছতার একটি চূড়ান্ত জায়গা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তির ইচ্ছা কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল, এটা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। রাজনৈতিক দল এভাবে চলতে পারে না। আবার আর্থিক স্বচ্ছতা নেই বলেই রাজনৈতিক দলগুলোতে মনোনয়ন-বাণিজ্যসহ নানারকম দুর্নীতি ও লেনদেনের কথা আমরা শুনি।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামোয় পরিবর্তন দরকার। ক্ষমতাকেন্দ্রীভূত হয়েছে সাংবিধানিকভাবে একসঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। একই ব্যক্তিকে বলা হচ্ছে দলের নেতা, তিনিই প্রধানমন্ত্রী, তিনি সংসদ নেতা। এভাবে ক্ষমতা এককেন্দ্রিক করে ফেলা রাজনৈতিক দলের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাংগঠনিক কাঠামোগুলো এমনভাবে তৈরি করা দরকার, যাতে এককেন্দ্রীকরণ না হয়।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুটি দলের ক্ষেত্রেই এই এককেন্দ্রিকতা দেখা যায়। আর এ কারণে দলের প্রধান ছাড়া অন্য কেউ আর জনগণের কাছে জবাবদিহির মধ্যে থাকে না। প্রাসঙ্গিকভাবে বলা যায়, এবারের ছাত্র আন্দোলনে কোনো একক নেতৃত্ব ছিল না। বরং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব ক্রমাগতভাবে বিস্তারিত হয়েছে। প্রথমে ছয়জন, তাদের যখন আটক করা হলো, তখন নিচ থেকে আরও নেতৃত্ব উঠে এসেছে। তারা দলের নেতৃত্বের পদ্ধতিটাই এমনভাবে তৈরি করেছে। তারা আন্দোলনের কৌশল হিসেবে বিষয়টি দেখিয়েছে, সাংগঠনিকভাবেও ঠিক এমনটাই হওয়া দরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার করতে হলে এ তিনটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি। তবে আমি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এ সংস্কার শব্দটি পছন্দ করছি না। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আমি বলতে চাই—রাষ্ট্রের পুনর্গঠন দরকার। সমগ্র রাষ্ট্রটাকেই পুনর্গঠন করতে হবে।

রাষ্ট্রের কোন জায়গাগুলোয় পুনর্গঠন প্রয়োজন বলে মনে করেন?

আলী রীয়াজ: রাষ্ট্রের কয়েকটি বেসিক ভিত্তি রয়েছে, সেখান থেকেই সংস্কার শুরু করতে হবে। যেমন, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ। বিচার বিভাগকে যতক্ষণ না à