হাজী এম, নুরুল হক (এম এ)
সম্ভবতঃ ১৯১৭/১৮ ইংরেজী সনে আমার জন্ম। আমি আমার পিতার সাত সন্তানের ষষ্ঠ সন্তান। আমার পিতা মরহুম ফজলুর রহমান মােক্তার। তাঁর অগাধ পান্ডিত্যের জন্য সরকার তাঁকে স্বর্ণপদক ও সনদ দান করেন। তিনি বাংলা, গণিত ও সংস্কৃতে বিশেষ বুৎপত্তি লাভ করেন। তাঁর অগাধ পান্ডিত্যের সম্বন্ধে আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ ১৯৫৩ ইংরেজীতে তার বাড়ীতে আমাকে বলিয়াছিলেন। আমি সাহিত্যবিশারদ হইলে কি হইবে আপনার পিতা ছাড়া এদেশে আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ পুঁথির বিশদ ব্যাখা করার মতাে লােক কেহ আছে বলিয়া আমার জানা নেই। আমিতাে তাঁর নিকট কিছুই নই।’ তাঁর পান্ডিত্যের জন্য তিনি বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেন এবং তখনকার পন্ডিত লােকেরা তাহাকে বিশেষ ভয়ের চোখে দেখিতেন। মুসলমানদের মধ্যে তিনিই একমাত্র যিনি তৎকালীন নর্মাল থার্ড ইয়ার পাশ ছিলেন। এজন্য সরকার তাহাকে একমাত্র মুসলমান হিসাবে চট্টগ্রাম জিলা শিক্ষা পরিদর্শক নিযুক্ত করেন। কিন্তু তিনি সরকারী চাকুরী ত্যাগ করিয়া আইন-ব্যবসা আরম্ভ করেন। মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার অগ্রদূত হিসাবে আমাদের সকল ভাইকে শিক্ষা প্রদানে কার্পন্য করেন নাই। বৃদ্ধ বয়সে তাহার আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল না থাকায় আমার শিক্ষাদীক্ষায় আমাকে বিশেষ সুযােগ সুবিধা দিতে পারেন নাই। তথাপি স্থানীয় উত্তর ভূষী মধ্য ইংরেজী স্কুল হতে আমাকে নিয়া ১৯২৪ (ইং) সালের জানুয়ারী মাসে চট্টগ্রাম সরকারী মুসলিম হাইস্কুলে তৃতীয় শ্রেনীতে ভর্তি করাইয়া দেন। আমার শিক্ষাদীক্ষার ব্যয়ভার বহন করা কষ্টকর ছিল বলিয়া অনেক সময় আমাকে অন্যত্র গৃহশিক্ষক হিসাবে থাকিতে হইয়াছিল। স্কুলে আমি বিনা বেতনে পড়িতাম এবং ১৯৩২ (ইং) সনে প্রথম বিভাগে প্রবেশিক্ষা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া সেই বছরেই চট্টগ্রাম সরকারী কলেজে ভর্তি হই। সেখানে শিক্ষকদের অনুকম্পায় সরকারী বৃত্তি লাভ করি। কিন্তু হঠাৎ ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে। মস্তিষ্কের অস্থিরতাজনিত রােগে আক্রান্ত হইয়া বহুদিন যাবত কলেজে উপস্থিত থাকা সম্ভব হইয় উঠে নাই। তথাপি প্রিন্সিপাল এ.কে. চন্দ, পদ্মিনীভূষণরুদ্র, খান বাহাদুর মােহাম্মদ হাসান, করুনাময় খাস্তগীর এবং ডঃ সুবােধ সেনগুপ্ত (এম, এ, পি. এইচ ডি, এস, পি. এইচ. ডি ইত্যাদির অপার অনুগ্রহ ও কৃপায় ১৯৩৪ (ইং) সনে আই.এ. এবং ১৯ ৩৬ সনে বি.এ. পাশ করি। আমার শিক্ষাজীবনে আমি বিশেষভাবে তাদের কাছে ঋণী। ডঃ সেনগুপ্ত প্রায় সময় আমাকে আর্থিক সাহায্য করিতেন। যিনি আমার পাঠ্যজীবনে সাধারন সাহায্য করিতে পারিয়াছিলেন, তিনি আমার বড় ভাই জনাব সােলতান আহমদ। তিনি বার্মায় সামান্য বেতনে চাকরী করিতেন। ছােট বেলা হইত উচ্চ শিক্ষা লাভের যে প্রগাঢ় ইচ্ছা উদ্দীপনা ছিল তাহা কোনদিনও শ্লথ হয় নাই। ছােটবেলা হইতে আমার স্বর্গীয় মাতা পেয়ারজান সদাসর্বদা আমাকে উৎসাহিত করিতেন। তাঁহার উৎসাহ, উদ্দীপনা ও কঠোর শাসনের মধ্যেই আমার উচ্চশিক্ষা লাভের আকাঙখা প্রবলভাবে বৃদ্ধি পায়। তিনিই সর্বপ্রথম এতদা অঞ্চলের ছেলেমেয়েদের আমাদের দেউড়ী ঘরে আরবী শিক্ষা দিতেন। ইহার জন্য সরকার তাঁহাকে মাসিক তিনটাকা করে পারিশ্রমিক দিতেন। ক্রমে উচ্চ শিক্ষা লাভের প্রবল আকাঙ্খা আমাকে পাগল করিয়া তুলিল। তাই স্থানীয় জমিদার অন্নদা চরন চৌধুরী ও হাজী জিন্নাত উল্লাহ সাহেব হইতে সামান্য কিছু টাকা ধার নিয়া ঢাকায় চলিয়া আসি। তখন আমার বড়ভাই সােলতান আহম্মদ আমার জন্য পঞ্চাশটি টাকা পাঠান। ইহার দ্বারা আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী ও আইন বিভাগে ভর্তি হই সত্য তবে অর্থাভাবে ও অনটনে অধিক অগ্রসর হওয়া অসম্ভব হইয়া উঠে। এসময় আমার সহপাঠী অধ্যাপক আসহাবদ্দীন এম. এ. আমাকে তাঁহার সাথে ঢাকা মুসলিম হলে রাখেন। তখন চট্টগ্রামবাসী মৌলভী আবুল হাসেম সাহেব আমাকে একটি গৃহশিক্ষকতার ব্যবস্থা করিয়ে দেন। তখন তিনি ঢাকা কলেজিয়েট হাইস্কুলের আরবী শিক্ষক ছিলেন। চট্টগ্রামে আমার শিক্ষাসাথী জনাব তােফায়েল আহমদ এম. এ. জনাব আব্দুস সালাম, জনাব ছিদ্দীক আহমেদ চৌধুরী আমাকে যথাসম্ভব আর্থিক সাহায্য দিয়া কোনরকমে টিকাইয়া রাখেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ডঃ মােহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ডঃ মাহমুদ হাসান ডি. লিট. ইত্যাদি মহানুভব ব্যক্তিদের সুনজর না থাকিলে আমার শিক্ষার দরজা তখনই বন্ধ হইয়া যাইত। এই অবস্থায় আমার ভাগ্য পরীক্ষা করি এবং দুবার বি. সি. এস. পরীক্ষায় অবতীর্ণ হই। কিন্তু সে যুগের বিরাট প্রতিযােগীতার মুখে টিকে থাকা অসম্ভব হইয়া পড়ে। ডাক্তারী ও স্বাস্থ্য পরীক্ষায় আমি অযােগ্য প্রমানিত হই। ইহার জন্য আমাকে এম. এ. পরীক্ষায় একবছর পিছাইয়া যাইতে হয়। অতএব আমি ১৯৩৯ ইং সনে ইংরেজীতে এম. এ. পাশ করিয়াই ঢাকা হতে কলিকাতা চলে যাই। তথায় তদানীন্তন চট্টগ্রাম জিলা প্রশাসক জনাব নিয়াজ মােহাম্মদ খান চট্টগ্রামবাসী আসাম বেঙ্গল পােস্টমাস্টার জেনারেল জনাব ফজলুর রহমান ও তৎকালীন শিপিং মাস্টার বাংলাদেশের সাবেক গভর্ণর জনাব জাকির হােসেন সাহেবদ্বয়কে ব্যক্তিগতভাবে আমাকে একটি চাকরি দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া সত্ত্বেও কোন কাজে আসে নাই। জনাব নিয়াজ মােহাম্মদ তাঁহার অফিসে একটি ভাল পােস্ট দেওয়ার জন্য ঢাকা হইতে আমাকে টেলিগ্রাম দিয়া নিয়াছিলেন সত্য কিন্তু ঐ চাকরীর জন্য তদানীন্তন মন্ত্রী সন্তোষ বােসের শালা প্রার্থী থাকাতে আমাকে দিতে পারেন নাই এবং আমাকে পূর্বোক্ত পদের নীচের পদটি নিতে অনুরােধ করিলে আমি উহা গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিয়া দুঃখ ভারাক্রান্ত হইয়া ঢাকায় চলিয়া আসি। ইহার পর নিয়াজ সাহেবের সাথে আমার আর দেখা হয় নাই। এখনও নিয়াজ সাহেবের কথা অমান্য করার জন্য আমি দুঃখ অনুভব করি এবং তঁহার কথা প্রায়ই স্মরণ করি। আমার কলিকাতা জীবনে আমাকে বিশেষ সাহায্য করেন যশােহরের খান বাহাদুর বজলুর রহমান সাহেব। কলà¦
