হারুন হাবীব: মনে হয় চোখের পলকেই ঘটে গেল ঘটনাটি। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর পেরিয়ে প্রায় চোখের পলকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে পৌঁছল! আর মাত্র একটি বছর, তার পরই ৫০ বছর হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার! সেই মহালগ্ন উদ্যাপন করবে বাংলাদেশ মহা আনন্দে। একাত্তরের সহযোদ্ধারা—যাঁরা রণাঙ্গন থেকে আর ফিরে আসেননি কিংবা এরই মধ্যে পৃথিবী ছেড়েছেন, তাঁরা নিঃশব্দে যোগ দেবেন সেই উদ্যাপনে।
ইতিহাসের অনেক অমোচনীয় ক্ষতচিহ্ন নিয়ে বাংলাদেশ এসে দাঁড়িয়েছে এই ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। আমরা যারা একাত্তরের মানুষ, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের বঙ্গীয় দোসরদের তাণ্ডব ও নৃশংসতা প্রত্যক্ষ করেছি, প্রতিরোধ করেছি, তাদের জন্য এই ক্ষতচিহ্নগুলো অনেক কষ্টের, অনেক যন্ত্রণার। তারপরও কিছু সান্ত্বনা আছে; ৩০ লাখ শহীদের প্রতি গেল ৪৮ বছর জাতি সম্মান প্রদর্শন করেছে, তাঁদের বেদিতে ফুল দেওয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে সেই ঘাতক-অমানুষদের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজনকে বিচারের হাতে সোপর্দ করা সম্ভব হয়েছে।
একাত্তরের জাতীয় রণাঙ্গনের মানুষ যাঁরা তাঁরা সবাই স্মৃতিকাতর হই প্রতি ডিসেম্বরে। মনে পড়ে অক্টোবর-নভেম্বর থেকেই দেশের প্রতিটি অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এদেশীয় অনুচরদের তাড়া করে একের পর এক গ্রামগঞ্জ ও শহর মুক্ত করতে থাকে মুক্তিবাহিনী। যে হানাদার সেনা ও রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও পিস কমিটির সদস্যরা ৯টি মাস ধরে সারা দেশে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ, নারী ধর্ষণ ও লুণ্ঠন-রাহাজানি চালিয়েছে, তারা দিশাহারা হয়ে পরাজয়ের দিন গুনতে থাকে। ডিসেম্বরের ৩ তারিখে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব। ভারতের পশ্চিম অংশে পাকিস্তান বাহিনী আকস্মিক আক্রমণ করার ফলে রাতারাতি পাল্টে যায় যুদ্ধের চালচিত্র। গঠিত হয় বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ সামরিক কমান্ড। শুরু হয় মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর যৌথ অভিযান। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পরাজিত পাকিস্তানি সেনাদের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ দেখার সুযোগ ঘটেনি, যা জীবনের এক বড় দুঃখ আমার। শেরপুর-জামালপুরের পর ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে পৌঁছে সেখানেই থেকে যেতে হয় আমাকে, যা এক বড় আক্ষেপ ব্যক্তিজীবনে। ৯ মাসের যুদ্ধ শেষে পরাজিত পাকিস্তানি জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি ঢাকার মাটিতে তাঁর ৯৩ হাজার সেনা নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। সেদিন থেকেই বাঙালির ঐতিহাসিক বিজয় দিবসের যাত্রা, যা অনাদিকাল ধরে চলবে।
কিন্তু বিজয়ের সেই মহা আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছিল ১৬ই ডিসেম্বরের আগের কয়েকটি দিন। পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি সেনানায়কদের সঙ্গে পরামর্শ করে ভয়ংকর এক হত্যাযজ্ঞের নীলনকশা তৈরি করেছিল আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনীর শীর্ষ নেতারা। জাতির মেধা ও মননকে ধ্বংস করার এই নীলনকশার বলি হয়েছিলেন সেদিন আমাদের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীরা—দার্শনিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, কবি, প্রাবন্ধিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ বুদ্ধিবৃত্তির শীর্ষ বাঙালিরা।
ভয়াবহ এই হত্যাযজ্ঞের হৃদয়বিদারক বর্ণনা অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে জানা যায়নি। জানা গেছে শুধু ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি আত্মসমর্পণের পর। দোমড়ানো-মোচড়ানো, ক্ষতবিক্ষত শত শত লাশ পাওয়া গেছে রায়েরবাজার, শিয়ালবাড়ী, মিরপুরসহ ঢাকার নানা বধ্যভূমিতে। দেশি ও বিদেশি নানা অনুসন্ধানে জানা গেছে, একমাত্র ঢাকা শহরেই ১৪ ডিসেম্বর প্রায় ২০০ শীর্ষ বুদ্ধিজীবীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্মম পন্থায় হত্যা করা হয়েছে।
আমাদের দুর্ভাগ্য, সেই সব ঘৃণিত অপরাধীরা আইনের হাত এড়িয়ে সদম্ভে চলেছে বহুকাল। বাংলাদেশ প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করেছে, ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস পালন করেছে; কিন্তু এসব ঘাতকদের আইনের হাতে সোপর্দ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং নানা রাজনৈতিক পালাবর্তে সেই হত্যাকারীরাই সামরিক ও আধাসামরিক শাসকদের ছত্রচ্ছায়ায় রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছে!
মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছিল এক বিরাট বধ্যভূমিতে, যার বিবরণ আছে প্রায় সারা বিশ্বেই। গবেষক রবার্ট পাইন তাঁর ‘ম্যাসাকার’ গ্রন্থে লিখেছেন, ফেব্রুয়ারি মাসের এক সেনা-বৈঠকে স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান, ‘ওদের তিন মিলিয়নকে খতম করে দাও, দেখবে বাদবাকিরা আমাদের হাত থেকেই খাবার নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে।’ পাকিস্তানি সেনাদের পরিকল্পিত এই গণহত্যা শুরু হয় ২৫ মার্চ ১৯৭১। রাতের অন্ধকারে অতর্কিতে অভিযান চালানো হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ও সাবেক ইপিআরের সদর দপ্তর পিলখানায়। প্রায় একই সঙ্গে ঘাতক বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, যা ছিল দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মূল উৎসভূমি। প্রথম রাতেই হত্যা করা হয় সাত হাজার নিরীহ ছাত্র-জনতাকে।
রবার্ট পাইনের বহুল আলোচিত ‘ম্যাসাকার’ গ্রন্থে বলা হয় : ‘কিন্তু এটা ছিল শুধুই শুরু। এক সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকার অর্ধেক মানুষ শহর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় এবং শুধু ঢাকাতেই কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। চট্টগ্রামেরও বেশির ভাগ মানুষ পালিয়ে যায়। বলতে গেলে গোটা দেশেই মানুষ পালাতে থাকে প্রাণভয়ে।’
নিরস্ত্র বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্দয় আগ্রাসনটি অগ্রসর হয় মূলত লিঙ্গভিত্তিক গণহত্যার রূপ নিয়ে। খ্যাতিমান সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ভাষ্য মতে, ‘এই গণহত্যার মূল টার্গেট ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনা, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), পুলিশ, বাঙালি প্যারা-মিলিটারি, আনসার এবং মুজাহিদ, হিন্দু, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থক, ছাত্র, বিশেষত যাঁরা প্রতিরোধ যুদ্ধà§