বায়েজিদ বোস্তামী আমাদের দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে অলৌকিক এক ব্যক্তিত্ব, ঈশ্বর ভক্তের প্রতীক, অনুকরণীয় এক ইসলামী আদর্শ বলে স্মরিত। প্রচলিত আছে তাঁর হাত ধরে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের কল্প কাহিনী, অভাব নেই শ্রদ্ধা ভক্তি মিশানো গাল গল্পের, আছে এক সুবিশাল কথিত মাজার বার আউলিয়ার দেশে বলে খ্যাত চট্টগ্রাম শহরের অদূরে। মোদ্দাকথায় তিনি এক ধ্রুব তারা বাংলার ইসলামী ধর্ম আকাশে। মরণোত্তর বায়েজিদের প্রতিভাসিত প্রচলিত কাহিনীর বাতায়নে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে তিনি কি সত্যি বাংলার মাটিতে কখনো পদ ধুলি দিয়েছিলেন? বাংলাদেশের ইসলাম প্রচারে সরাসরি তাঁর কি কোন ভূমিকা আছে? এর এক কথায় উত্তর- না। ধর্মীয় বিশ্বাসের উত্তপ্ত হাওয়া সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের বিচার বুদ্ধি কতখানি দূরীভূত করে, ধর্মের রঙিন বর্ণনা কি ভাবে তাদের নেশা গ্রস্থ করে রাখে, তারা যে সত্য অসত্য বিচারে তথ্য প্রমাণের খোজ রাখে না, ধর্মের অলৌকিকত্বে সহজে মুগ্ধ হয়ে তারা ছাইপাসেও পূর্ণ বিশ্বাস আনে- তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বায়েজিদ বোস্তামী সম্পর্কে প্রচলিত গল্পকথা।
ছোট বেলায় বাবার সাথে একবার গিয়েছিলাম সেই মাজার দেখতে। মাজারের কোন মর্মার্থ বুঝার বয়স তখনো হয়নি আমার, বায়েজিদ কে ছিলেন তাও জানতাম না। সেখানে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছি কিছু মানুষের মাজার সন্মুখে উচ্চঃস্বরে ক্রন্দন দৃশ্য দেখে (সম্ভবত জীবণ যুদ্ধে পরাজয়ের প্রচন্ড হতাশা থেকে) এই দৃশ্য আমাকেও ব্যথিত করেছে, আবার মজা পেয়েছি মাজারের সামনের এক পুকুরে ইয়া বড় বড় কচ্ছপের বিচরণ দেখে, তাদের খাইয়ে।
কচ্ছপের কথা যখন উঠেই গেছে তখন এই ফাঁকে এই বিরল প্রজাতির কচ্ছপ নিয়ে দু-চার কথা বলে নিই। এর বৈজ্ঞানিক নাম হল অ্যাসপিডেরিটিস নাইগ্রিক্যান্স। প্রাণিবিজ্ঞানী অ্যান্ডারসন ১৮৭৫ সালে সর্বপ্রথম ভারতের জাদুঘরে রক্ষিত দুটি নমুনা থেকে বোস্তামীর কচ্ছপের প্রজাতিটির সন্ধান পান। রক্ষিত নমুনা দুটি ছিল চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী পুকুর থেকে সংগৃহীত। ১৯১২ সালে প্রাণিবিজ্ঞানী এন এনানডেলের মতে বোস্তামীর কচ্ছপ একসময় ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকা থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত বিশাল এলাকাজুড়ে বিচরণ করত। এই পুকুরে কচ্ছপ গুলো কিভাবে এল এতদিন পরে তা জানার কোন উপায় নেই আজ। তবে যেভাবে আসুক না কেন মাজারের এই পুকুরে শত শত বছর ধরে বাস করা কাচ্ছপগুলো বিশ্বে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রজাতির তা নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। এই প্রজাতির কচ্ছপ এতই দূর্লভ ১৯১৪ সালে প্রাণিবিজ্ঞানী এন এনানডেলের ও অন্য প্রাণিবিজ্ঞানী এম শাস্ত্রী এক গবেষণায় উল্লেখ করেন বোস্তামীর কচ্ছপ বর্তমানে শুধু চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী মাজার সংলগ্ন পুকুরেই টিকে আছে। পৃথিবীর কোথাও এই প্রজাতির কচ্ছপ আর দেখা যায় না। ২০০২ সালে পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক সংস্থা, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) কর্তৃক বোস্তামী কচ্ছপ কে চরমভাবে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়। তাই এই কচ্ছপেরর ওপর ২০০৭ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেল এক ডকুমেন্টারি তৈরি করে নিয়ে যায়। এগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য- আকারে এই কচ্ছপ অনেক বড় হয় এবং ওজনও নাকি বেশি হয়। কালের সাক্ষ্যি হয়ে শত শত বছর এদের বেঁচে থাকার অপূর্ব ক্ষমতা আছে। মিথ প্রচলিত আছে বায়েজিদ বোস্তামী নিজে এসব কচ্ছপ চট্টগ্রামে নিয়ে এসেছিলেন।আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন বায়েজিদ দুষ্ট জ্বীনদের কচ্ছপ বানিয়ে বন্ধী করে রেখেছেন।

দুঃখজনক খবর জীব বৈচিত্রের নিদর্শন নিরীহ এই কচ্ছপগুলোকে ২০০৪ সালের মে মাসে একবার পুকুরে বিষ ঢেলে এদের বংশ র্নিবংশ করার চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু জাতীয় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের ত্বরিত পদক্ষেপে কোনমতে রক্ষা পেয়ে যায় কচ্ছপ গুলো।
বায়েজিদ বোস্তামী ৮০৪ খ্রীষ্টাব্দে ইরানের বোস্তাম শহরে জন্ম গ্রহণ কর

