১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। দেশের সর্ববৃহৎ এই রাজনৈতিক দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাঙালীর রাজনৈতিক ইতিহাসকে দিয়েছে সমৃদ্ধির গতি। তবে গতিময় এই চলার পথে কখনো কখনো থামতেও হয়েছে তাদের। ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়ায় তৈরি হয়েছে ক্ষত। রবিবার গণভবনে তৃণমূলের নেতাদের সেই ক্ষতের গল্পই শুনিয়েছেন দলটির বর্তমান সভাপতি শেখ হাসিনা।
তৃণমূলের নেতাদেরকে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৮২ সালে আওয়ামী লীগ ভাঙায় আমাদের বড় ক্ষতি হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘১৯৮২ সালে আব্দুর রাজ্জাক সাহেব পার্টি ভেঙ্গে চলে গেল, এই যে মতিয়া চৌধুরী আপা এখানে আছেন, তিনি রাজ্জাক সাহেবের পা ধরে বসে ছিলেন যে আপনি পার্টিটা ভেঙে যাইয়েন না। জলিল ভাই (প্রয়াত সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল) গিয়ে পা ধরে ছিলেন, পার্টিটা ভেঙে যাইয়েন না। আমি নিজে বলেছিলাম, আপনি পার্টি ভেঙে যাচ্ছেন কেন, রাজনীতি তো আপনার সঙ্গে করে আসছি। আপনি ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, আমি ইন্টারমিডিয়েটে কলেজের ভিপি হলাম। আপনি পার্টি ভাঙবেন কেন? উনি তখন বাকশাল করবেন বলে পার্টি ভাঙলেন।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৭৫-এর ঘটনার পরে আবার আওয়ামী লীগের ওপর যে আঘাত আসে- তখন এটাই ধারণা করেছিল যে আওয়ামী লীগ আর কখনো ক্ষমতায় যেতে পারবে না। এটাই ছিল সকলের পরিকল্পনা।’
অতীতের স্মৃতিচারণা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর আমি সংগঠন গোছাতে শুরু করি। আপনাদের মনে আছে এই সংগঠন গোছাতে কম কষ্ট করতে হয়নি। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো আমি ৮১ সালে আসলাম ৮২ সালে পার্টি ভাঙলো। এই ভাঙাটা আমাদের জন্য খুব ক্ষতি ছিল। আমার দুঃখ লাগে যে যাদের ওপর সবচেয়ে বেশি ভরসা করেছি, দেশের বাইরে থাকতে যারা আমার সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ করেছেন যে তাদের সঙ্গে কাজ করবো তারাই আমাকে হতাশ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘১৯৭৯ সালে মুক্তি পাওয়ার পর ৮০ সালে লন্ডনে আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এর আগে ১৯৭৯ সালে আমার সঙ্গে যখন তাদের যোগাযোগ হত তখন সব সময় যার কথা বলে দিতাম, তিনি যাতে দলটা চালাতে পারেন তার কিছু ব্যবস্থাও আমি করে দিয়েছিলাম। যাদের জন্য করে দিয়েছি আমি ফিরে আসার পর তারাই আমার সঙ্গে বিট্রে করে চলে গিয়েছে। এটা হচ্ছে আমাদের দুঃভাগ্য।’
বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘তখন আওয়ামী লীগের নেতারা জিজ্ঞেস করতেন, আমরা কাকে নিয়ে কাজ করবো? এত গ্রুপিংয়ের মধ্যে কোথায় যাবো? ৮২ সালে পার্টিটা ভেঙে চলে গেলেন। ঐ ভাঙনটা যদি না হতো তাহলে হয়তো আওয়ামী লীগ ৮০ দশকে সরকার গঠন করতে পারত, নির্বাচন করে জয়ী হতে পারত। তখন আর এরশাদ ওভাবে মার্শাল’ল দিয়ে গেঁড়ে বসতে পারত না।’
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এরশাদের বিরুদ্ধে আমরা যখন আন্দোলন করি তখনও একটা ষড়যন্ত্র ছিল। এক জেনারেলের পরিবর্তে আরেক জেনারেল। আমি সেটা মানিনি। আমি বলেছি, এক জেনারেলের পরিবর্তে আরেক জেনারেল না, আমরা গণতন্ত্র চাই। আমরা নির্বাচন চাই, গণতন্ত্র চাই। এর জন্য অনেক সমালোচনা সম্মুখিন আমাকে হতে হয়েছে। অনেকে অনেক কথা বলেছে, অনেক ষড়যন্ত্র করেছে। কিন্তু আমি আমার বাবার কাছ থেকে শিখেছি, যেটা নীতি হিসেবে জানবো, সেটা মেনে নিবো। সেখানে কে কি বললো সেটা বড় কথা না। সবশেষে দেখা গেছে যে যেটা আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেটা ঠিক ছিল।’
তিনি বলেন, ‘দলের ভেতরে বাইরে সমালোচনা অনেক কিছু ছিল। ভাঙন হলো। কারণ আমি তখন কেবল আসছি। কেবল আসার পর যখন এ রকম একটা ধাক্কা খেলাম, তারপর সারা বাংলাদেশ আমাকে ঘুরতে হয়েছে, সংগঠন তৈরি করতে হয়েছে। দিনের পর দিন মিটিং, রাতের পর রাত সবার সঙ্গে বসে আলোচনা করে করে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ সংগঠনগুলোকে নতুন ভাবে তৃণমূল থেকে গড়ে তুলতে হয়েছে। ওভাবে সংগঠন করে করে আজকের আওয়ামী লীগ একটা পর্যাায়ে এসে পৌঁছেছে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেসময় আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে দেশ বেচে দিবে, মসজিদে আজান হবে না, উলুধ্বনি হবে। এ রকম নানা অপপ্রচার করা হত। সেগুলো আমাদের মোকাবেলা করতে হয়েছে, জবাব দিতে হয়েছে।’
আব্দুর রাজ্জাকের ফিরে আসা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৯১ সালে উনি আসলেন জোটের সঙ্গে নির্বাচন করতে। তাকে দুটি সিট দিতে হবে। মাদারীপুর ও শরিয়তপুরে দুইটা সিট নিল আর সব জায়গায় কাঁচি মার্কায় একজন করে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে দিল। মানে ঐ কাঁচি মার্কা দিয়ে আওয়ামী লীগকে কাঁচি কাটা করা। ২ বা ৪ হাজার করে ভোট কেটে নিল।’
স্বৈরাচার পরবর্তী সময়ে প্রথম জাতীয় নির্বাচনের স্মৃতিচারণা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নির্বাচনে জেতা কিন্তু আলাদা বিষয়। অনেকে অনেক বড় নেতা হতে পারেন কিন্তু জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়াটা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। কে মানুষের কাছে বেশি যেতে পেরেছেন, কে মানুষের সবচেয়ে বেশি আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন, কে ভোট আনতে পারবেন এটা কিন্তু অংকের মতো হিসেবের ব্যাপার। ইলেকশন করাটা কিন্তু একদম অংকের মতো হিসেব।’
তিনি বলেন, ‘সে সময়ের বৈরি পরিবেশে জনগণের সমর্থন ছিল আমাদের একমাত্র শক্তি। জোটের মধে যদি বেঈমানি না হতো, মনোনà§