মো. তাজুল ইসলাম রাজু

চট্টগ্রাম জেলার দক্ষিণ পূর্ব এলাকার একটি গ্রামের নাম খিতাপচর | যেটি হযরত বু-আলী কলন্দার (রহ.) নামে প্রতিষ্ঠিত বােয়ালখালী থানায় অবস্থিত । হযরত বু-আলী কলন্দার (রহ.) এক মহান উঁচু মর্যাদার অলি ছিলেন বলে তাঁর পবিত্র নামে প্রতিষ্ঠিত এই থানাটিতে সর্বদা আউলিয়ার অবস্থান বিরাজ করে। যুগ যুগ ধরে এই থানায় এলাকার প্রায় জায়গায় বিভিন্ন সময় আল্লাহর প্রিয় বন্ধু মহান আউিলিয়াগণের অবস্থান চিহ্নিত করা আছে। তেমনি এক মহান আউলিয়া ব্যক্তিত্ব মাহবুবে ছােবহানী কুতুবে রাব্বানী মােজাদ্দেদে জামান হযরত আল ইউসুফ শাহ (রহ.) আলাই আরবী। এ সম্বন্ধে কিছু তথ্য পাঠকদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

হযরত আল ইউসুফ শাহ (রঃ) আলাই আরবীর অবস্থান খিতাপচর গ্রামে। খিতাপচরের তাৎপর্য থেকে বুঝা যায়, খেতাব’ শব্দ থেকে খিতাপ, যার আভিধানিক অর্থ সম্মানসূচক উপাধি বা খিতাব আর চর’ শব্দের অর্থ গুপ্তদূত, বিচরণশীল বা গুপ্তভাবে বিচরণ করা। তাহলে বুঝা যায় সম্মানসূচক উপাধি পাপ্ত ব্যক্তিরা গুপ্তভাবে বিচরণ করার নামই খিতাপচর ।

এখানে স্পষ্ট যে, পূর্বের মর্যাদা সম্পন্ন এলাকাতে এই মহান আউলিয়ার অবস্থান। তিনি সুদূর আরব স্থান থেকে এসে অবস্থান করেছেন। কেনই বা তাঁর আগমন? কে তাকে উম্মােচন করলাে? এখন সে বিষয়ে আসা যাক ।

যদিও আভিধানিক অর্থে এই গ্রামের যথেষ্ট মর্যাদা আছে, তারপর ও লােক মুখে প্রকাশ, একদিকে কড়লডেঙ্গা পাহাড় অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর । পাহাড় আর সাগরের মাঝে সম্পর্কের স্থানটির চিহ্ন এই গ্রামে পাওয়া যায় বলে একে চর বা খিতাপচর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই এলাকায় তখনকার গােটা কয়েক লােক ব্যতীত সকলে ছিলাে কুসংস্কারাছন্ন। তবে তারা আল্লাহ একত্ববাদকে বিশ্বাস করতাে। নবী করিম (সঃ) কে জানতাে। কিন্তু তাঁদের নির্দেশিত কাজ করতাে না। এমনকি অনেকে জানতাে না, কিভাবে আল্লাহ্ এবং রাসুল (দঃ) কে অনুসরণ করতে হয়। এইভাবে কেটে যাচ্ছিল এলাকার মানুষের জীবন। এ সময় যুগের ত্রাণকর্তারূপে সমগ্র জগত আলােকিত করে উদিত হন এই জেলার ফটিকছড়ি গ্রামে গাউছুল আজম হযরত শাহসুফী মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (কঃ) প্রকাশ হযরত ছাহেব কেবলা কাবা।

তখন অসংখ্য জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন পুরুষ জড়াে হতে লাগলেন মাইজভান্ডার দরবার শরীফে। নিতে লাগলেন তার মানবতাবাদী দর্শনের প্রকৃত শিক্ষা। ঐ অসংখ্য গুণী ব্যক্তিত্বের অন্যতম বােয়ালখালী থানার আহলা দরবার শরীফের প্রাণপুরুষ হযরত কুতুবে জমান হযরত জনাব কাজী আছাদ আলী কেবলা কাবা (কঃ)। জনাব কাজী ছাহেব কেবলা হযরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী’র নিকট এত যে, সম্মানিত ছিলেন তাঁকে নাম ধরে ডাকার আগে জনাব’ বলে সম্বােধন করতেন।

এই মহান জ্ঞানী ও সম্মানিত ব্যক্তি যাওয়া আসা করতেন খিতাপচর এলাকায়। তাঁর আসা-যাওয়াতে এলাকার মানুষের ধর্ম চেতনা ও মানবিক চিন্তা-চেতনা বৃদ্ধি পায়। উল্লেখ্য, খিতাপচরে মাইজভাণ্ডারী দর্শনের স্বীকৃতি প্রাপ্ত আর এক মহান ব্যক্তিত্ব গােল্ড মেডােলিস্ট প্রাপ্ত মাহবুবে ছােবহানী কুতুবে রব্বানী খলিফায়ে গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী শাহসুফী হযরত মৌলানা সৈয়দ আবদুল আজিজ খিতাপচরী’র (কঃ) জন্ম স্থান। তিনি নিজ পীরের ছােহবতে এসে এলাকার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করতেন। ফলে এ এলাকায় জনাব কাজী আছাদ আলী সাহেব কেবলার (কঃ) ভূমিকা এবং উপস্থিতি দর্শনীয় হয়ে উঠে। জনাব কাজী সাহেব কেবলা (কঃ) এলাকার মানুষকে খােদা রাসুল প্রেমী হওয়ার তাগিদ দিতে গিয়ে দেখেন যে, এলাকার অনেকে নামাজের নিয়ত জানতােনা।

তখন তিনি এক অভিনব পদ্ধতিতে নামাজ শিক্ষাদান শুরু করলেন। নামাজের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে খােদা প্রেমে বিভাের হওয়ার জন্য একটি নিয়ত শিখাতেন। নিয়তটি হলাে; “নজানি নঊনি ত নামাজ পড়, আহলার কাজী কয় আল্লাহু আকবর (না জানি না শুনি তবু নামাজ পড়, আহলার কাজী বলে আল্লাহু আকবর)।

প্রেক্ষাপট: আমাদের চট্টগ্রামের রয়েছে নিজস্ব উপভাষা, যেমনি আছে আরও অনেকের। এটুকু বলেই চট্টগ্রামের উপভাষাকে আলাদা করা যায় না কোনভাবেই। ড. মাহবুবুল হক এর মতে, ‘বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের উপভাষার সঙ্গে চট্টগ্রামী উপভাষার সুস্পষ্ট ও ব্যাপক মাত্রার পার্থক্য রয়েছে। এ অঞ্চলের লোকের মুখে এ ভাষা এমন অদ্ভুতভাবে উচ্চারিত হয় যে, অন্য অঞ্চলের লোকজন দীর্ঘকাল এখানে বসবাস না করলে এই ভাষার অনেক ধ্বনি তার কাছে যদি অর্থবহ না হয় তবে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।’ এ উপভাষার রয়েছে আলাদা টান। দুর্বোধ্য বানানরীতি, বৈচিত্রময় উচ্চারণরীতি চট্টগ্রামের উপভাষাকে করেছে একেবারেই ভিন্ন রকম। চট্টগ্রামের উপভাষা আলাদা হবার নানাবিধ কারণও রয়েছে। আবহমান কাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ভিনদেশী নাগরিক-শাসকদের যাতায়াত, প্রকৃতিগতভাবে এখানকার পরিবেশ আর প্রাকৃতিক সম্পদ হাতছানি দিয়ে ডাকতো যে কাউকেই। বাণিজ্যবন্দর; সেইসঙ্গে পাহাড়-সমুদ্র-সমতল, উপজাতি, রেঙ্গুন-আকিয়াবের সঙ্গে ঐতিহ্যিক মেলামেশাÑ সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের জনজীবনে আসে ব্যাপক সংকরভাব। আরবী-ফার্সী-উর্দু-হিন্দী এমনকি ইংরেজী থেকেও চট্টগ্রামী উপভাষা নিয়েছে প্রয়োজনীয় শব্দ বা শব্দাংশ। বিভিন্ন ধর্মের সংমিশ্রণ, সূফি-দরবেশ-ঋষীর আগমন চট্টগ্রামের উপভাষা সমৃদ্ধ হওয়ার পেছনে রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। মুখচলতি, আপাতকঠিন এ উপভাষা নিয়ে কাজ করেছেন অনেকেই। আবদুর রশিদ ছিদ্দিকী, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, মুহম্মদ আবদুল হাই, এফ ই পারজিটার, কৃঞ্চপদ গোস্বামী, বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়, লক্ষ্মণ মজুমদার, মনিরুজ্জামান, সুবোধরঞ্জন সরকার, মনসুর মুসা, দীননাথ সেন প্রমুখের সঙ্গে অনায়াসেই নেয়া যায় ড. মাহবুবুল হক এর নাম। নানা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, নিয়মিত গবেষণা ড. হক এর কাজকে দিয়েছে মূল্যবান স্থান।

আমরা সাধারণত নামায বিষয়ে অনেক তথ্য এবং নিয়ম না জানার স্বর্তেও প্রতি রাকাতে ইমামের পিছনে দাড়িয়ে ফরজ নামাজগুলো আদায় করতে পারি। তাতে নামাজ আদায় হওয়ার এক প্রকার মনে সন্তুষ্টি আসে। মানুষ যখন এভাবে নিয়মিত নামাযমুখী হয় তখন আজ-কাল একটা-একটা করে বিভিন্ন হুকুম-আহকাম রপ্ত করতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। তাই এ শ্লোকটি ছিল মানুষকে আল্লাহ প্রেমে উজ্জীাবত করতে অনুপ্রেরণাময় আবেদন।

জনাব কাজী আছাদ আলী সাহেব কেবলার (কঃ)  এ গুণের মহিমায় মহিমান্বিত হতে লাগল অত্র এলাকা। বিরােধীরাও আকৃষ্ট হতে লাগল মাইজভাণ্ডারী দর্শনের প্রতি। এলাকার উঠতি বয়সের ছেলেরা তখন এসব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করার প্রত্যয়ে প্রতি বৃহস্পতিবার জায়গায় জায়াগায় মাহফিল, হালকায়ে জিকিরের আয়ােজন করে থাকে। তেমনি একটি জায়গা তখন কার ছেলেরা বেছে নিলাে, যেখানে নিরিবিলি পরিবেশে তারা আল্লাহ রাসুলের স্মরণে মশগুল থাকতে পারে। যে জায়গাটি তারা বেছে নিলােঐ জায়াগাটি ছিলাে এক স্বচ্ছ এবং পরিস্কার জঙ্গলের এর কাছে একটি খােলা মাঠ। জঙ্গল বলতে আছে শুধু গােটা কয়েক অশ্বত্থ গাছ। উঁচু ভরাট মাটি (যাকে উঁই পােকার ঘােনা বলে থাকতাে তখনকার মানুষেরা)। এর পাশে কিছু আগাছা ।

প্রতি বৃহস্পতিবার এই জায়গায় এসে জমায়েত হতেন আশেকগণ। যার যার সামর্থ অনুযায়ী জিনিষ নিয়ে এসে জড়াে হয়ে মিলাদ দরূদ কিয়াম এবং ছেমা করতেন। এতে তাদের হৃদয় মন এক অনাবিল আনন্দে ভরে যেতাে। (তাদের মধ্যে কয়েক জনের নাম উল্লেখ করা হলাে) (১) মােঃ গােল ছমদ মাঝি, (২) ওয়াজর রহমান, (৩) অছিয়র রহমান, (৪) আবদুস সত্তার, (৫) আলী আহমদ ফকির, (৬) আমিন উল্লাহ প্রকাশ শীল ফকির, (৭) আবদুল হক মাস্টার, (৮) লুৎফুল্লাহ, (৯) নুরুল্লাহ্, (১০) ইব্রাহীম মল্ল, (১১) ইউনুছ মল্ল । আরাে অনেকে ছিলেন সময়ভাবে তাঁদের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি বলে দুঃখিত।

তাঁদের কাছ থেকে শােনা যায়, এই মাহফিলে জনাব কাজী সাহেব কেবলা স্বয়ং উপস্থিত থাকতেন এবং ঐ অশ্বত্থ গাছের তলায় গিয়ে কার সাথে যেন তিনি কথা বলতেন। তখনকার ভাষা উর্দু ছিল বলে অনেকে সে ভাষা বুঝতে পারে নি।

কথায় বলে রতনে রতন চিনে। জনাব কাজী আছাদ আলী সাহেব কেবলার (কঃ) একটি গুণ ছিলাে তিনি কবরস্থানের পাশের যাওয়া সময় মুর্দাদের সাথে কথা বলতে পারতেন। একদিন কাজী আছাদ আলী ছাহেব কেবলা কাবা (কঃ) ঘােষণা করেন, এখানে এক মহান ব্যক্তি আছেন। তাঁকে তােমরা সম্মান করাে। তাহলে নিজেরাই সম্মানিত হবে এবং খােদা প্রাপ্তির সহজ রাস্তা খুঁজে পাবে ।

তিনি আরও বলেছিলেন এই মহান আউলিয়া সুদূর আরব থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য এখানে আগমন করেছিলেন। কারণ তখন এই এলাকায় মুসলমান ছিলােনা। ছিলাে মগের রাজ্য। তিনি একা আসেননি। তাঁর সাথে আরাে অনেকে এসেছেন। এই বলে তিনি মাজারের নমুনা দেন। তিনি নাম ঘােষণা করেন “মাহবুবে ছােহবানী  কুতুবে রব্বানী হযরত ইউসুফ শাহ্ আলাই আরবী (রঃ) এবং তাঁর

সঙ্গে আগত হযরত হাছান ইউনানী (রঃ) এবং হযরত শাহ্ চান্দ আউলিয়ার (রঃ) নাম। এদের প্রত্যেকের মাজারের নক্সা উন্মােচন করেন জনাব কাজী সাহেব কেবলা (কঃ)। তবে এলাকায় কেরামত বেশী পরিলক্ষিত হয় হযরত ইউসুফ শাহ্ (রঃ) আলাই আরবীর । অশ্বত্থ গাছের বাগানের অবস্থান বিধায় তাঁর মাজারটি অশ্বত্থ তলা দরগাহ শরীফে (চট্টগ্রামী ভাষায় আটতলা দরগাহ্ শরীফ) নামে পরিচিত ।

– সময়ের ব্যবধানে কত কিছুই পরিবর্তন হয়। এই পবিত্র মাজার শরীফ নিয়ে কেরামত এবং বহু অলৌকিক ঘটনার বিবরণ লিখে শেষ করা যাবে না। এক সময় এটি ছিল খেজুর পাতার ঘর। তারপর হল মাটির ঘর । এখন পাকা দালান। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সৃষ্টির কল্যাণে এটিও সংস্কার হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কত কথা, কত স্মৃতি এগুলাের সাথে জড়িত, তা কেবলা আল্লাহই জানেন।

এ যুগের নবীণরা  অতীতের এসব দিশারী আশেকদের প্রতি জানাই অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা। তাঁদের স্মৃতি অমর হােক। এক সময় এই মহান ব্যক্তিত্বের পবিত্র ওরশের তারিখ ছিলাে পহেলা চৈত্র । কালের বিবর্তনে এই অনুষ্ঠানটি এখন পহেলা ফাল্গুন তারিখে অনুষ্ঠিত  হয়। বর্তমানে পহেলা ফাল্গনের এই মিলন মেলায় হাজার হাজার আশেক ভক্তগণ হাজির হয়ে মহান স্রষ্টার রেজামন্দি হাসিল করেন।

বর্তমানে অত্র এলাকায় প্রায় ২০/২৫টি জায়গায় তাঁর ওরশ শরীফ অনুষ্ঠাত হয়ে থাকে। আগে মূল ওরশে শরীক হতেন জনাব কাজী আছাদ আলী কেবলা কাবা (কঃ)। এরপর তাঁর বংশধরেরা এই ওরশের উপস্থিত হয়ে একাধারে হযরত ইউসুফ শাহ আলাই আরবীর (রহ.) এবং জনাব কাজী আছাদ আলীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

তথ্যসূত্রঃ জনাবা কনিজা খাতুন, জনাব খাদেম খুল্যা মিঞা, জনাব মৌলভী মাহবুব উল হক, সর্ব সাং খিতাপচর ।

এ নিবন্ধটি ১৯৯৯ সালে সেপ্টেম্বর সংখ্যায়  মাইজভাণ্ডারী দর্শণের মূখপত্র মাসিক আলোাকধারায় প্রকাশিত হয়েছিল।

আরো পড়ুন :

বোয়ালখালীতেই হযরত গাউছুল আজম মাইজভান্ডারীর (কঃ) ব্যবহৃত ঐতিহাসিক পালঙ্ক

খিতাপচরের ইতিহাস ঐতিহ্য

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here