লিটন দাশ গুপ্ত

‘স্বপন যদি মধুর এমন হোকনা মিছে কল্পনা,
জাগিও না আমায় জাগিও না…………’
জলধর সেন এর এই গানের কথার প্রসঙ্গ এনে বলতে চাই, স্বপ্ন দেখা একটি মধুর বিষয়, সেটা জাগা অবস্থায় ভবিষ্যৎ কোন পরিকল্পনা নিয়ে দিবাস্বপ্ন হোক; আর নিদ্রিত অবস্থায় ঘুমের ঘোরে হারিয়ে যাওয়া কোন অতীতস্মৃতি নিয়ে নিশিস্বপ্ন হোক। আমাদের সবার স্বপ্ন কল্পনা পরিকল্পনা চিন্তা ভাবনা ইত্যাদি বিষয়ে স্বতন্ত্র স্বাধীনতা রয়েছে। বাকস্বাধীনতাকে হনন করা যায়, কিন্তু স্বপ্ন ভাবনা কল্পনা ইত্যাদির মত বিষয়ের স্বাধীনতাকে কেউ রোধ করতে পারেনা। তাই চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে অনেকের মত আমারও মনে কত ভাবনা আসে! আজ প্রকাশযোগ্য কিছু ভাবনা প্রচার করতে চাই।
পৃথিবীর পরিবেশকে দুইভাবে ভাগ করা যায়। একটি জীব অন্যটি জড়। আবার জীবকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, একটি উদ্ভিদ অন্যটি প্রাণি। এখন চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বলতে চাই, পৃথিবীতে প্রাণী দেহে (অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানবদেহে) কোভিট-১৯ নামে ভাইরাস গত প্রায় তিনমাস যাবৎ মহামারী হয়ে দেখা দিয়েছে। যার প্রেক্ষাপটে এই পর্যন্ত ১৯৭টি দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। এর সর্বশেষ পরিণতি কখন কি হবে, এখনো পর্যন্ত সঠিক বুঝা যাচ্ছেনা। অন্যদিকে উদ্ভিদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ‘পঙ্গপাল’ নামক একজাতীয় পতঙ্গ উদ্ভিদ বা খাদ্যশস্যের উপর আক্রমণ! এই পতঙ্গ সম্পর্কে জানা যায়, এরা ছোট এক দলে বা ঝাঁকে দশ লক্ষের মত পঙ্গপাল থাকে, যেগুলো নাকি একদিনে ৩৫ হাজার মানুষের খাদ্য সাবাড় করতে পারে। আফ্রিকা মহাদেশে জন্ম নেয়া এই পতঙ্গের বড় ঝাঁকে থাকে ৮ কোটির মত পঙ্গপাল, যা ৬৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এই বিষয়ে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা মহামারি হিসাবে আসতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছে। এইদিকে পৃথিবী নামক এই গ্রহের মানুষ কোভিড-১৯ নামক ভাইরাস আগে কখনো দেখেনি বা শুনেনি। আবার পঙ্গপাল নামে এই পতঙ্গ আগে হাল্কা শোনা গেলেও এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি। হঠাৎ এই সময় এইসব কোথায় থেকে কিভাবে এলো, এই নিয়ে রহস্য ও ধু¤্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। যেমন- নভেল করোনা ভাইরাস সম্পর্কে প্রথমদিকে ধারণা ছিল, এটির উৎস হচ্ছে কোনো প্রাণীদেহ। কারণ মানুষের আক্রান্ত হবার ঘটনাটি ঘটেছে চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান শহরে, যেখানে একটি বাজারে বিভিন্ন প্রাণি ক্রয়বিক্রয় করা হয়ে থাকে। অনেক গবেষক বলছেন, চীনের হর্সশু নামের একপ্রকার বাদুরের সঙ্গে এই ভাইরাসের ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে।
আবার বিভিন্ন মাধ্যমে শোনা যাচ্ছে অন্যরকম কথা। বলা হচ্ছে, করোনা ভাইরাস ছড়ানো একজাতীয় জীবাণু অস্ত্র। এই অবস্থায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আসলেই কি এটি জীবজন্তুর দেহ থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে, নাকি জীবাণুঅস্ত্রের ল্যাবরেটরি থেকে উদ্দেশ্যমূলক ভাবে এটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে? সংক্রমণ যত ছড়িয়ে পড়ছে, তার সাথে পাল্টা দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে নানা ষড়যন্ত্রের তত্ত¡। এসব তত্ত¡গুলো আসছে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন থেকে। যেমন- বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় লিখছে, চীনকে শায়েস্তা করতে যুক্তরাষ্ট্র জীবাণু অস্ত্র হিসাবে, চীনে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়ে গেছে। একজন চীনা গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতিক তার টুইটার অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন, উহানে গত বছর অক্টোবর মাসে একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আসা মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি দল এই ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়ে গেছে। এইদিকে রাশিয়া সরকারের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন মিডিয়ায় এই ভাইরাস ছড়ানোর জন্য ব্রিটেনকেই দায়ী করা হচ্ছে। রাশিয়ান একজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে বলেন, ব্রিটেন এই করোনা ‘অস্ত্র’ তৈরি করেছে। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ অনেকে সরাসরি বলছেন, করোনা ভাইরাস চীনের তৈরি একটি জীবাণুঅস্ত্র। যা জীবাণুঅস্ত্রের পরীক্ষাগার থেকে এই ভাইরাস উদ্ভব হয়ে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই হচ্ছে বিভিন্ন শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহের পক্ষে বিপক্ষে ভিন্নমত ও অভিমত। তবে আমাদের মত সাধারণ মানুষের কাছে হয়ত অজানায় থেকে যাবে, এটি কি কোন প্রাণী দেহ হতে ছড়ানো ভাইরাস নাকি রাষ্ট্র কর্তৃক রাষ্ট্রে ছড়ানো জীবাণুঅস্ত্র।
যাই হোক, শুরুতেই যা বলছিলাম চিন্তা ভাবনার স্বাধীনতার কথা। তাই সেই হিসাবে স্বাধীনদেশের নাগরিক হিসাবে মুক্তচিন্তায় বিষয়বস্তুর কোন অভাব নাই, ভাবনার কোন ধরাবাধাও নেই। এই অবস্থার প্রেক্ষাপটে এই মুহূর্তে বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমার ভাবনায় আসছে এলিয়েনের কথা। এমন অজানা বিস্ময়ের কাজ এলিয়েনের নয়তো!
সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। মানবসভ্যতায় তার প্রমাণ রেখেই চলেছে। কয়েক হাজার টন ভারী মালামাল মানুষসহ উড়োজাহাজ আকাশে বাতাসে ভাসাচ্ছে, আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে পারমাণবিক বোমার সাহায্যে প্রতিপক্ষ দেশকে অব্যর্থ নিশানা করে মানচিত্র থেকে মুছে দেবার সক্ষমতা রয়েছে, এছাড়া সুপার কম্পিউটার কৃত্রিম উপগ্রহ রোবট আরো কত কি আবিষ্কার! পাড়ি দিচ্ছে মহাকাশ চেষ্টা করছে অন্যগ্রহে পাড়ি দিতে। এই সব কারণে উন্নত আর পরাশক্তি রাষ্ট্রের জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সফলতায় বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। কিন্তু এতসব আবিষ্কার সফলতা উন্নতি করা উন্নত মস্তিষ্কের মানবজাতি, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অতিসূক্ষè আনুবীক্ষণীক জীবাণুর কাছে এই মুহূর্তে বা আপাতত পরাস্ত। বিশ্বের মহাশক্তিধর পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলো আজ দিশেহারা বিপর্যস্ত। বিশ্ব ইতিহাসে মানবসভ্যতার অপরিসীম অগ্রগতি এত অবদান মনে হচ্ছে আজ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অতি সামান্য এই জীবাণুর কাছে কিছুই নয়। এই থেকে প্রমাণিত হয়, উন্নতমস্তিষ্কের প্রাণি হবার সত্তে¡ও মানুষ প্রকৃতির কাছে কতটুকু অসহায়। যদিও কোভিড নাইনটিন ভাইরাসের আক্রান্ত হবার তুলনায় মৃত্যুর হার অনেক কম। তারপরেও কথা হচ্ছে এই ভাইরাস মিউটেশন প্রক্রিয়ায় ঘনঘন জিন পরিবর্তন করে যদি আরো অধিকতর শক্তিশালী হয়ে উঠে, কিংবা আগামীতে আরো বহুগুণ শক্তিশালী অন্যরকম নতুন কোন ভাইরাস সৃষ্টি হয়, তাহলে মানবসভ্যতা বিলুপ্ত হবার সম্ভাবনার কথা কল্পনা বা ভাবনায় আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
আবারো আসি আমার ভাবনার কথায়; একটু আগে এলিয়েনকে নিয়ে সন্দেহের কথা বলছিলাম। অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে এটা আবার কি কথা, এলিয়েনকে নিয়ে কল্পনাতে লেখক কোন ধরনের আল্পনা আঁকছে! এই বিষয়ে বছর দুয়েক আগে প্রয়াত আধুনিক কালে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এর বক্তব্য উল্লেখ করা দরকার। তিনি শতভাগ নিশ্চিত মহাবিশ্বে ভিনগ্রহে আরো অনেক উন্নত প্রাণী বা এলিয়েন আছে। যারা পৃথিবীর মানুষের তুলনায় জ্ঞানবিজ্ঞানে লক্ষ কোটি বছর এগিয়ে।
এবার ২০১৭ সালে পৃথিবী থেকে ভিনগ্রহে প্রেরিত একটি বৈজ্ঞানিক বার্তার কথায় আসি। জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ পৃথিবীর কাছাকাছি অর্থাৎ ১২.৩৬ আলোকবর্ষ দূরে ‘লুইটেন’ নামক একটি নক্ষত্রের সন্ধান পান। এই নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে কয়েকটি গ্রহ আবর্তিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা সেখানে ‘জিজে২৭৩বি’ নামক একটি গ্রহে এলিয়েনের অস্তিত্ব রয়েছে। উল্লেখ্য পৃথিবীর কাছাকাছি লুইটেন নক্ষত্রটি কয়েক হাজার বা কয়েক লক্ষ কিলোমিটার দূরে এমন নয়। এখানে কাছাকাছি মানে প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার গতি বেগে ঐ নক্ষত্রের ঘুর্ণিয়মান গ্রহটিতে যেতে সময় লাগবে ১২ বছরের বেশি। সেই অনুযায়ী গাণিতিক হিসাবে দেখা যায়, এলিয়েনরা যদি সেই বার্তা পেয়ে সাথে সাথে প্রতিউত্তর প্রেরণ করে, তাহলে আগামী ২০৪২ সালে কোন একসময় এলিয়েনের বার্তা পৃথিবীতে এসে পৌঁছাবে। এইদিকে স্টিফেন হকিং এই ধরণের র্বাতা প্রেরণে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। কারণ তিনি মনে করেন, এলিয়েনরা কোন এক সময় পৃথিবী নামক গ্রহটিতে এসে মানবসভ্যতা ধ্বংস করে তাদের নিজেদের উপনিবেশ গড়ে তুলবে। তাই এই বার্তা প্রেরণের ফলে তাঁর এই ধারণা আরো ত্বরান্বিত হবে।
এই অবস্থার প্রেক্ষাপটে কভিড-১৯ আর পঙ্গপাল পতঙ্গ পরিস্থিতিতে কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র কন্ঠে বৃটিশ আমল থেকে জনপ্রিয় সেই গানটি আবারো উল্লেখ করতে চাই-
‘স্বপন যদি মধুর এমন হোক না মিছে কল্পনা/ জাগিও না আমায় জাগিও না/ জাগরণের বাস্তবে, মানুষের কি কাজতবে/ ঘুমের ঘোরে স্বপন যদি সুখের মাপে অল্প-না/ জাগিও না আমায় জাগিও না—-’ এখানে জলধর সেনের ‘স্বপন’ মানে আমার ‘ভাবনা’। তাই এই লেখার ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আমার ‘এলিয়েন’ ভাবনা ভঙ্গ করাও কারো উচিত হবেনা!
লেখক: লিটন দাশ গুপ্ত (শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক)

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here