– প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

বাংলার সমাজ সংস্কৃতির ইতিহাস পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, প্রাচীন বাংলা ও পরবর্তী বাংলা সমাজ ছিল বিভিন্ন জনপদ ও ধর্মীয় বিশ্বাসে বিভক্ত। খ্রীষ্টপূর্ব ১৭৫০ ও এর কাছাকাছি সময়ে আর্যদের ভারত আগমনের বিষয়টি সর্বজন স্বীকৃত। প্রথমে রাঢ়ে এবং পরে বরেন্দ্র অঞ্চলে এদের বসতি স্থাপনের আগেও এ অঞ্চলে অষ্ট্রিক, দ্রাবিড়, ভোট-চীনসহ বিভিন্ন নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। এরপরে সেমিটিক ও মধ্য এশিয়ার লোকদের আগমন ঘটলেও আর্যদের মুখের ভাষাই পরবর্তীতে ‘বাংলা ভাষা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এ অঞ্চলে খ্রীষ্টীয় ৮ম শতকের শুরুতে মুসলমানদের আবির্ভাব হলেও এ অঞ্চলে বহু প্রাচীন কাল থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের লোকেরা এক ‘অপূর্ব ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধনে’ আবদ্ধ ছিল। এ অঞ্চলে তাই হিন্দু বা মুসলিম সংস্কৃতি আলাদা পরিচয় বহন না করে ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ হিসেবেই এক সমার্থক স্বরূপে উন্মোচিত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক জীবনের রূপরেখা ঊনবিংশ শতাব্দীর রেঁনেসাসে সর্বোতভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

‘মানব প্রেম’ মানুষের মহিমাকে যে এক অলৌকিক সৌন্দর্য্য ও ঐশ্বর্য্যে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে; বাংলার কাব্যে, মহাকাব্যে, নাটকে, উপন্যাসে, গদ্যে, দর্শনে, সংগীত ইত্যকার সকল ক্ষেত্রে এর অপূর্ব প্রতিফলন ঘটেছে। সৌভাগ্যের বিষয় হচ্ছে এই, বাংলার অনন্য-সুন্দর সবুজ পর্বতমালা ও সমুদ্র পৃষ্ঠকে ঘিরে বাঙালির জীবনের যে জয়যাত্রা, মূলত তা এ চট্টগ্রাম থেকেই উদ্ভুত। উল্লেখ্য যে, এ চট্টগ্রামেই জন্মগ্রহণ করেন ঐশী মানব প্রেমের প্রবক্তা, মাইজভান্ডারী দর্শনের প্রণেতা মহান সাধক হযরত গাউসুল আযম মাওলানা শাহসুফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (কঃ) এবং তাঁরই মাধ্যমে বিকশিত মাইজভান্ডারী ত্বরিকার যাবতীয় বিশ্বজনীন কর্মকান্ড তথা তাসাউফের অন্যতম ধারণাকে ভিত্তি করে এ দেশে নতুন ইসলামী যুগের সূচনা ঘটে। এটিকেই বস্তুতপক্ষে ‘বাংলার বেলায়ত ও আধ্যাত্মিক জগতের নবজাগরণ বা রেনেসাঁস’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়।

আমরা সকলে অবগত আছি যে, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ) এর দুটি নাম আছে। একটি আহামদ, অপরটি মোহাম্মদ। মহান রাব্বুল আলামীন সৃষ্টির আদিতে বিরাজ করছিলেন ওহাদানিয়াতের বাগানে গুপ্ত ধনভান্ডার স্বরূপে। তিনি সৃষ্টির অনাগত আগ্রহ থেকে নিজেকে প্রকাশ করার জন্য নূরে মোহাম্মদীকে ‘সাজারাতুল ইয়াকীন’ বৃক্ষে স্থাপন করেন। ৭০ হাজার বৎসর স্রষ্টার ধ্যানে মগ্ন থাকার এক পর্যায়ে নিজের নুরানী চেহেরা মোবারক অবলোকন করে আমাদের প্রিয় নবী এতই বিমুগ্ধ হলেন যে, লজ্জার আতিশয্যায় তিনি মহান স্রষ্টাকে সেজদা করেন। অত:পর লজ্জায় ঘর্মাক্ত হলে মহান স্রষ্টা নূরে মোহাম্মদীর মাথার ঘাম থেকে ফেরেশতাবৃন্দ এবং চেহেরা মোবারকের ঘাম থেকে আরশ-কুরশীসহ সমগ্র মখলুকাত সৃষ্টি করেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, হযরত রাসূলে করীম (দ:) বলেছেন, “আমি আল্লাহর নূর হতে সৃষ্ট এবং জগতের সকল কিছুই আমার নূর হতে সৃষ্ট’। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (দঃ) ও হযরত ইউসুফ (আ:) মধ্যে কে বেশি সুন্দর! একদা হযরত ছিদ্দিকে আকবর (র:) পক্ষ থেকে এ রকম প্রশ্ন করা হলে আমাদের প্রিয় নবী উত্তরে বলেছিলেন, “আমার নূরের সৌন্দর্য্যকে দশ ভাগে বিভক্ত করে প্রথম অংশ দ্বারা গেলমান, ফেরেশতা ও বেহশত, দ্বিতীয় অংশ দ্বারা গ্রহ-নক্ষত্র, চন্দ্র-সূর্য্য, তৃতীয় অংশ দ্বারা স্বর্ণ-রূপা ও মনি-মুক্তা, চতুর্থ অংশ দ্বারা গাছ-পালা, তরুলতা, পঞ্চম অংশ দ্বারা পক্ষীকুল, ষষ্ঠ অংশ দ্বারা পশুরাজি, সপ্তম অংশ দ্বারা মাটি, আগুন, পানি ও বাতাস, অষ্টম অংশ দ্বারা পুরুষ মানুষ, নবম অংশ দ্বারা নারীকুল এবং দশম অংশ দ্বারা মহান রাব্বুল আলামীন হযরত ইউসুফ (আ:) কে মহা সৌন্দর্য্যরে অধিকারী করেছিলেন।”

অতএব এটিই প্রতিষ্ঠিত যে, ‘আহামদ’ সৃষ্টির আদিতে জগৎ সৃষ্টির রহস্যের মূল আধার হিসেবে বিরাজমান ছিলেন এবং ‘মোহাম্মদ’ রূপে সামগ্রিক ত্রাণকর্তা হিসেবে বিশ্বে প্রকাশ লাভ করেন। এ নামদ্বয়ের প্রভাবে বিভক্ত বিশ্বব্রহ্মান্ডে সকল নবী, রসূল, অলিকুল সমাজ। এ দুটি নামের মধ্যে বেলায়েতের শানের সাথে সংশ্লিষ্ট নাম ‘আহামদ’ আল্লাহ-তায়ালার আদি সৃষ্ট এবং ‘আহামদ-মোহাম্মদ’ এই দুই নামেরই সার্থক সমাবেশ ‘মারাজাল বাহারাইন’ অর্থাৎ ‘লা নবীয়া বায়াদী’ বা তিনিই শেষ নবী। রসূলে পাক (দ:) বলেছেন, ‘আমার সাথে আল্লাহর এমন এক সম্পর্ক এর স্তর আছে যার নাম হচ্ছে ‘বেলায়েতে ওজমার’ স্তর। এই স্তরে পৌঁছানোর ক্ষমতা কোন ফেরেশতা বা নবীর নবুয়তী গুনের মধ্যে নেই’। প্রিয় রসূল (দ:) এর ধরাধাম ত্যাগের পর সর্বকালে সর্বযুগে ইমামুল আউলিয়া হযরত আলী (রা:) কে কেন্দ্র করেই এই বেলায়েতের শান সম্প্রসারিত হতে থাকে।

নবুয়ত সমাপ্তির প্রায় এগারশত বৎসরের ব্যবধà