প্রকাশ-১৭/১২/২০২০, পুণ প্রকাশ ১৪/১২/২০২১, ৩০/১২/২০২২

মোঃ তাজুল ইসলাম রাজু

“মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ” উপমহাদেশের অন্যতম তথা বাংলাদেশের প্রধান আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। এই মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ আজ কেবল একটি দর্শন, একটি চেতনা, একটি পরলৌকিক সাধনার নামই নয়। এই আধ্যাত্ম কেন্দ্র আজ একটি মানবতাবাদী চেতনা, বিচার সাম্যমূলক সমাজ বিনির্মানের সংগ্রাম ও লৌকিক জীবন সাধনার প্রতীক। এই দরবারের প্রাণ পুরুষ হযরত গাউছুল আজম শাহসুফী মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (কঃ) অনুসৃত নীতিমালা সকল গোঁড়ামী ও অশুভের বিরুদ্ধে একটি সামাজিক বিপ্লব।

No photo description available.প্রাণ ও ত্রাণের তাগিদে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ছুটে যায় মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে। এই দরবার খেটে খাওয়া মেহনতী মানুষের লৌকিক পরলৌকিক শান্তি ও সান্তনার ঠিকানা। এই দরবার আধ্যাত্মিক, লৌকিক, নৈতিক বৈশিষ্ট মিলিয়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রের নির্দেশক নিশানাও বটে।

১৮২৬ সালের ১৪ জানুয়ারী তথা বাংলা সনের মাঘ মাসের প্রথম তারিখে এই ধরাধামে আবির্ভূত হয় হযরত গাউছুল আজম শাহসুফী মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (কঃ)। অসংখ্য জ্ঞানী-গুণীকে তিনি এই অভিন্ন আর্দশে আকর্ষণ করলেন। এ রকম অসংখ্য আধ্যত্মিক গুণি ব্যক্তিত্বের সমাবেশ চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানায় । এই উপজেলায় স্বীকৃতি প্রাপ্ত খলিফা রয়েছেন ৭জন। দর্শণের অনুসারী খলিফা রয়েছেন অসংখ্য। যা দিন-দিন বর্ধিত হচ্ছে।

অলি-আউলিয়াদের চারণ ভূমি বোয়ালখালী খিতাপচর গ্রাম। আল্লাহর সর্বোত্তম প্রিয় ধর্ম ইসলামকে তরান্বিত করার জন্য যখন তার (আল্লাহ) প্রেরিত পুরুষ হিসাবে আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ)কে এই ধরনীতে পাঠালেন তখন থেকে নবী ওয়ালাদের দায়িত্ব পড়ে বিভিন্ন এলাকায় ইসলাম কায়েম করতে। যে দায়িত্ব হিসেবে সুদূর আরববাসী আউলিয়াদের আগমন ঘটে খিতাপচর এলাকায়। সে আউলিয়াদের মাধ্যমে খোদার সানিধ্যে প্রাপ্ত হওয়ার এই এলাকায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে মাইজভাণ্ডারী দর্শন । তার মধ্যে হযরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (কঃ)’র একজন মহান খলিফা হযরত কাজী আছাদ আলী কেবলা কাবা (কঃ)। তাঁর মাধ্যমে এলাকায় আরববাসী আউলিয়াদের অভিষেক ঘটে। তৎমধ্যে হযরত সৈয়দ ইউছুপ শাহ (রহঃ), হযরত সৈয়দ হাচান ইউনানী শাহ (রহঃ), হযরত সৈয়দ ইউচুপ নবী (রহঃ), হযরত  সৈয়দ শাহচাঁদ আউলিয়া (রহঃ), হযরত ছৈয়দ মাসুম শাহ্ (রহঃ) এদের নাম উল্লেখযোগ্য।

রয়েছেন হযরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (কঃ)’র আরো একজন মহান খলিফা হযরত মওলানা শাহসুফি সৈয়দ আবদুল আজিজ খিতাপচরি মাইজভাণ্ডারী (কঃ), খলিফায়ে আমিরভাণ্ডারী (ক.) হযরত আবদুল জলিল শাহ আমিরী (রহঃ), হযরত এজাহার শাহ (রহঃ)। তাঁদের মাধ্যমে এলাকার গৌরব উজ্জ্বল হয় মাইজভাণ্ডারী দর্শন ভিত্তিক আল্লাহ্ রাসূলের সান্নিধ্যে অর্জনের ক্ষেত্রে। এরপর থেকে ধাপে ধাপে আগমন হতে থাকে মহান আউলিয়াদের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে, যা হাসর কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্ধমান থাকবে।

কালের পেক্ষাপটে এসব আউলিয়ার আগমন অব্যাহত রয়েছে এই এলাকায়, আছেন খলিফায়ে বাবাভাণ্ডারী (ক.) হযরত মওলানা সৈয়দ ছৈয়দুর রহমান খিতাপচরি আল মাইজভাণ্ডারী (কঃ), খলিফায়ে আল্লামা গাজী শেরে বাংলা (রহ.) হযরত শাহসুফি মাওলানা আবদুল মাবুদ শাহ্ আলকাদেরী (রহঃ), খলিফায়ে আমিরভান্ডারী (ক.) হযরত শেখ মোজাহারুল হক আমিরী (প্রকাশ মজু শাহ) (রহঃ) যেখান থেকে শত-শত মানুষের মুক্তির আশার বাণী নিয়ে সুখী সমাজ গঠন করে চলেছেন।

এই ব্যক্তিত্ববান আউলিয়াদের পাশাপাশি আগমন ঘটে বিভিন্ন জায়গার খ্যাতিমান আউলিয়াগণ। যারা ছিলো আল্লাহর প্রেরিত রাসুলের অনুসারী। এ এলাকায় আগমন হয়েছে অছিয়ে গাউছুল আজম হযরত শাহসুফি মাওলানা সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (কঃ), এবং তদ্বিয় আউলাদে পাক। সুন্নিয়তের সিপাহশালার হযরত আল্লামা গাজী শেরে বাংলা আজিজুল হক আলকাদেরী (রহঃ), হযরত মাওলানা সৈয়দ সোলাইমান আমিরী (কঃ) এবং তদ্বিয় আউলাদে পাক। গাউছে জামান হযরত মাওলানা শাহসুফি সৈয়দ শফিউল বশর আল মাইজভাণ্ডারী (কঃ) এবং তদ্বিয় আউলাদে পাক। হযরত শাহসুফি মাওলানা কুতুবে জমান জনাব কাজী আছাদ আলী কেবলা কাবা (কঃ) তদ্বিয় আউলাদে পাক । হযরত মওলানা শাহসুফি সৈয়দ আবদুল আজিজ খিতাপচরি মাইজভাণ্ডারী (কঃ) তদ্বিয় আউলাদে পাক। হযরত মাওলানা শাহসুফি ইসলাম শাহ নকশবন্দী (রঃ) তদ্বিয় আউলাদে পাক এবং আরো অনেক আউলিয়াগণ তাঁদের বন্ধুদের সান্নিধ্যকে বেগমান করার জন্য এই এলাকাকে ধন্য করে চলেছেন।

উল্লেখ্য বিশ্বঅলি শাহানশাহ হযরত মাওলানা সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (কঃ) এর মহান আগমন হয়েছিলো এই গ্রামে, যা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।

এই দিনে তিনি কানুনগোপাড়া থেকে খিতাপচর হয়ে মাইজভাণ্ডার পৌঁছান
এই দিনে তিনি কানুনগোপাড়া থেকে খিতাপচর হয়ে মাইজভাণ্ডার পৌঁছান

ধর্মীয় চেতনা আর আউলিয়াদের ভক্ত প্রেমিকের কারণে এসব মহান ব্যক্তিত্ববান পুরুষদের আগমন ঘটেছে। সে কারণে এলাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে উঠে মাইজভাণ্ডারী দর্শন ভিত্তিক। তথাপি এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ আবাল বৃদ্ধ বনিতারা সাধারণভাবে যাতায়াত করতেন মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে। সেখান থেকে তখনকার সময়ে কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ বিশ্বঅলি শাহানশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (কঃ)Õর ভক্ত- প্রেমিক হয়ে উঠেন।

১৯৮৮সালের ১২অক্টোবর বাংলায় ২৬আশ্বিন এই ধরাধাম হতে বিদায় নিলেন বিশ্বঅলি শাহানশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (কঃ)। তখন সারা জগতের ন্যায় এই এলাকার ভক্তদের মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া।

তাই কবির ভাষায় বলি-

“হঠাৎ যেন অকস্মাৎ বিচলিত হয়ে গেল আকাশের নক্ষত্র,

মাঝ রাতে নিভেগেলো পূর্ণিমায় এক ফালী চাঁদ।

ঝুর ঝুর করে যেন ঝরে পড়লো বাগানের সব ফুল।

কুয়াশায় যেন ঘিরে রাখলো কাক ডাকা ভোর ।

গতি পরিবর্তন করে নিলো পৃথিবীর সব নিয়ম।

শুধু আপনাকে…….আপনাকে হারানোর বেদনায়।”

তখন গোটা কয়েক যুবক মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন খোদার প্রদত্ত নেয়ামতের খণি শাহানশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (কঃ)) কে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। তারা একের পর এক মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন কিভাবে শ্রদ্ধা জানানো যায়। তাই অনুমতির জন্য মাইজভাণ্ডার গাউসিয়া হক মঞ্জিলের সভাপতি সৈয়দ নুরুল বখতেয়ার শাহ্ (মামার) কাছে গেলে তিনি  তীক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তার পরিচয়ে কিছু পরামর্শ, কিছু স্নেহ, কিছু ত্বরিকতের কথা বলে নির্দেশ দিলেন শোক সভা করার জন্য।

মনের আনন্দে ফিরে এলেন এবং অন্যদের জানালেন (উল্লেখ্য, অনুমতির জন্য যারা গিয়েছিলেন, তারা হলেন, মোঃ আবুল কাশেম এবং মোঃ জাফর আহমদ)। অন্যদের মধ্যে আরো যারা ঘনিষ্ঠভাবে ছিলেন তারা হলেন সর্বজনাব আজিজুল হক (মরহুম), সৈয়দ নেজাম উদ্দিন কালু, সৈয়দ শাহবুদ্দিন, আবু সুলতান, জাফর আহমদ, আবুল কালাম, আবুল কাশেম, নুরুল ইসলাম, আবুল বশর, সুলতান আহমদ, আবুল মনছুর, রওশন আলী, মরহুম ইউসুফ (লিভার ইউসুফ), মরহুম হামিদ উল্লাহ খান বাবু, আজিজুর রহমান আংকুর, মুছা খান প্রমুখ।

উপস্থিত সবাই সর্বসম্মতির ক্রমে জনাব আজিজুল হককে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করেন। জনাব আজিজ বিজ্ঞ সাংগঠনিক দক্ষতাকে পুঁজি করে নেমে গেলেন আল্লাহর মহান সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। এইভাবে সম্পন্ন করলেন প্রথম অনুষ্ঠান। পরবর্তিতে সিদ্ধান্ত নিলেন প্রতি বছর কিভাবে এই মহান অনুষ্ঠানকে উদযাপন করা যায়। যার স্মরণে অনুষ্ঠান তিনি যদি মেহেরবাণী করেন, মহান আল্লাহ্ যদি সহায় হন, তাহলে ধরে রাখা সম্ভব বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।

অতঃপর দ্বিতীয় বার অনুমতির জন্য যাওয়া হয় মঞ্জিলের সাধারণ সম্পাদক জনাব জামাল আহমদ সিকদার সাহেবের কাছে। উল্লেখ্য তখন শ্রদ্ধাভাজন সভাপতি জনাব সৈয়দ নুরুল বখতেয়ার শাহ্ ইহকাল ত্যাগ করে আপন মুর্শিদ চরণে নিয়োজিত হয়েছেন। জনাব সিকদার সাহেব অনুমতি দিলেন মহান মুর্শিদকে স্মরণ করে এটি শোক সভা না হয়ে স্মরণ সভা হলে মুনিব আরো বেশী খুশী হবেন। তখনই আত্মপ্রকাশ করেন এই খিতাপচর হকভান্ডারী স্মরণ সভা সংসদ।

এইভাবে ১,২,৩, তারপর ১২… তারপর ২৪… এবার ৩২তম অর্থাৎ যুগের পর যুগ শেষ করে ৩য় যুগের দ্বারপ্রান্তে এসে নিয়মিতভাবে চলছে এই অনুষ্ঠান। এই বর্ণ্যাঢ্য ও মর্যাদাময়ী অনুষ্ঠানগুলিতে সামাজিক ব্যক্তিত্ব, জনপ্রতিনিধি, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও ওলামায়ে কেরামগণ উপস্থিত হয়ে সফলতার স্বাক্ষর বহন করে আসছে।

এবার আরো কিছু কথাঃ জীবন মানে যুদ্ধ, যুদ্ধ মানে বেঁচে থাকা, বেচে থাকা মানে সাধনা, আর সাধনা মানে জ্ঞান অর্জন, জ্ঞান মানে শিক্ষা। কোরআনের কথা Òপড় তোমার প্রভূর নামে”। হাদীসের ঘোষণা- Òদোলনা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন কর।” শাহানশাহ্ মাইজভাণ্ডারীর বাণী- Òজ্ঞানের যে সাধনা মনে উদারতা ও চরিত্রে দৃঢ়তা আনে সেটাই সঠিক জ্ঞান।”

মূলত একজন মানুষের প্রকৃত সত্ত্বা হচ্ছে তার অর্জিত জ্ঞান। জ্ঞানের শক্তি যদি সোচ্চার থাকে তাহলে মনে আসে অধম্য সাহস। মাইজভাণ্ডারী দর্শন সে রকম এক সাহস-সাহসিকতার প্রয়াস। তাই এই সংসদের নবপ্রয়াসে এলাকায় জ্ঞানচাতক কিছু সন্তান মিলে মাইজভাণ্ডারী দর্শনে মাধ্যমে নিজেদের আরো বলিষ্টভাবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক পর্যায়ে উপস্থাপন করার জন্য এগিয়ে আসেন।  দীর্ঘ নয় বছর অতিক্রমের পর ১৯৯৭সালে প্রথম ইউনিট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেন হকভাণ্ডারী গণ পাঠাগার।

উদ্যেক্তা ছিলেন মো. তাজুল ইসলাম রাজু, মরহুম নুরুন্নবী মাষ্টার, সহযোগী ছিলেন মোস্তফা কামাল কালু, মো. মোরশেদ আলম মনজু, আলীনুর মিন্টু প্রমুখ। পরবর্তিতে এলাকার তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ এতে যুক্ত হয়ে যায়। যা এখনো বিদ্যমান আছে।

হকভাণ্ডারী গণ পাঠাগারটি ছিল তখনকার সময়ে একটি অবৈতনিক শিক্ষা কেন্দ্র। যেখানে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়মিত বিচরণে সারাক্ষণ থাকতো মুখরিত। শুধু তাই নয় যাদের অভ্যাস জ্ঞানচর্চা, যাদের অভ্যাস অবসরে কিছু পড়া বা লেখার তাদেরও অবাধ বিচরণ এই পাঠাগার অভ্যন্তরে। আবার এদের দিয়ে পাঠাগার কর্তৃক বিভিন্ন প্রতিযোগীতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। যে কারণে সকলের হৃদয়ে প্রাণস্পন্দনে জেগে থাকতো উৎসাহ আর উদ্দীপনায়।

এই পাঠাগারের মাধ্যমে সচেতন পাঠকদের ভূমিকা পালন করে আউলিয়াদের পবিত্রধন্য এই এলাকাকে অব্যহত অফুরান রহমতের খনি হিসেবে চিহ্নিত করে সুন্দর সমাজ গঠনে এক মহান অঙ্গীকার ছিল অবিস্মরণীয়।

একটি শ্লোগান ছিল এমন-

আমরা চাইব একটি সুন্দর

পৃথিবী গড়ে তুলতে,

যেখানে থাকবেনা যুদ্ধের পঙিখলতার ছোঁয়া,

হানাহানির নেশা, অপঘাত মৃত্যুর আতঙ্ক,

যেখানে থাকবে শুধু শান্তি,

অকৃত্রিম ভালবাসার প্রাচুর্য ।

মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব অনেক,

কর্তব্য অনেক, আমাদের গড়ে তুলতে হবে।

সেই স্বপ্নিল-সুন্দর পৃথিবী।

একটি সুন্দর স্বপ্নিল সমাজ গঠনে সকলের সহযোগিতা কামনায় এগিয়ে যাওয়া এ সংগঠনটির বয়স হলো-২০২০ সালে ৩২ বছর। এ  সংগঠনের অনেক কার্যক্রম কালের স্বাক্ষী বোয়ালখালীর ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে মিশে যাচ্ছেন সময়ের গতিতে। বিগত সময়ে এ সংগঠনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত ছিলেন মাইজভাণ্ডারী পরিমন্ডলের অনেক সাহেবজাদা, পীরজাদা এবং আওলাদেপাকগণ। সংযুক্তি ছিলেন দেশের খ্যাতিমান সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ এবং খ্যাতনামা ওলামায়ে কেরামগণ।

প্রথম অনুষ্ঠান ছিল ৫/১২/১৯৮৮ ইংরেজী শুক্রবার। স্থান ছিল -এন. কে. বি. আর. দাতব্য চিকিৎসালয় মাঠ (বর্তমান সারোয়াতলী পরিবার পরিকল্পনা হাসপাতাল) পরবর্তিতে ধারাবাহিক অষ্টম অনুষ্ঠান- ১৫/১২/১৯৯৫ সালে আলহাজ্ব দেলোয়ার হোসেন মসজিদ প্রাঙ্গনে এসে বর্তমান পর্যন্ত সব অনুষ্ঠানই এ ময়দানে হচ্ছে। এ অনুষ্ঠানেই (১৫ ডিসেম্বর ১৯৯৫ সাল) প্রথমবার বিশ্বঅলি শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (কঃ)’র একমাত্র সন্তান রাহবারে আলম হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী (মঃ) প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেছিলেন।

শুরু থেকে উল্লেখযোগ্য আলোচক ছিলেন- মরমী গবেষক সৈয়দ আহমদুল হক, আলহাজ্ব ব্যারিষ্টার বজলুছ ছাত্তার, শাহজাদা মাওলানা নুরুল আলম আমিরী, শাহজাদা ডাক্তার খায়রুল বশর আমিরী, চট্টগ্রাম বিশ্বদ্যিালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ আবদুল মান্নান চৌধুরী। ড. সিরাজুল হক, ড. এ. এন. এম. মুনির আহাম্মদ চৌধুরী, ক্যাপটেন আমিরুল ইসলাম, জামাল আহমদ সিকদার, চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক প্রশাসন গোলাম রসুল, চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব এ. এন. এম. মোমিন, চট্টগ্রাম বন্দরের ক্যাপটেন আলী নবী চৌধুরী, প্রফেসর রনজিৎ কুমার চক্রবর্তী, অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হোসেন খান, প্রফেসর নু. ক. ম আকবর হোসেন, অধ্যাপক রেজাউল করিম মামুন, অধ্যাপক এ. ওয়াই. এম. জাফর, এম. ওছমান গণি, জসিম উদ্দিন মাহমুদ, সৈয়দ মো. নাজিম উদ্দিন, আলহাজ্ব মৌলানা খায়রুল বশর হক্কানী, মৌলানা আবদুর রহীম আলকাদেরী, মৌলানা ফরিদ উদ্দিন আলকাদেরী, মৌলভী কাজী মাহবুব উল হক, মৌলানা ইকবাল ইউছুফ, মৌলানা ইমদাদুল হক মুনিরী, হাফেজ আবুল কালাম, মৌলানা মোজাম্মেল হক কুতুবী, মৌলানা নুর হোসেন হেলালী।

উল্লেখযোগ্য পরম সম্মানিত মেহমান ছিলেন- মোহাম্মদ রেজাউল আলী জসীম চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার কামালুর রহমান, জনাব খায়রুল বশর।

মুলতঃ এ সংগঠনের সাথে শুধু এলাকাবাসী নয়, মাইজভাণ্ডারী পরিমণ্ডলে যতগুলো মনজিল এবং খলিফাগণদের দরবার আছে তৎসংশ্লিষ্ট ত্বরিকত ভিত্তিক কমিটির কেন্দ্রিয় এবং শাখা কমিটিতে আওতাভূক্ত সকল সদস্য ও কর্মকর্তাবৃন্দ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংযুক্ত ছিলেন এবং বর্তমানেও আছেন। দীর্ঘ তিন যুগের কাছাকাছি এ সংগঠনে উনাদের উৎসাহ, আর্থিক, কায়িক শ্রম ও মেধা দিয়ে পরিপূর্ণ রাখার চেষ্টা করেছেন বলে এখনো সফলভাবে প্রতিবছর অনুষ্ঠানগুলোকে একটি প্রবাহমান গতিধারার মধ্যে আছে। আমি ( মো. তাজুল ইসলাম রাজু) এ সংগঠনের একজন শুভাকাঙ্খি হিসেবে সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে অসীম কৃতজ্ঞতা জানাই।

আমি মনে করি, ১৯৮৮ থেকে সুদীর্ঘ দুই যুগেরও বেশী সময় ধরে এই সংগঠনের সাথে কিছু সচেতন মানুষ জড়িত হয়ে ক্ষণে-ক্ষণে কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে প্রাপ্তি ও স্বীকৃতির সমান্তরালে পরিচালিত করতে দুর্লঙ্ঘ বিবেচিত, দুরারোহ অনেক বাঁধা অতিক্রমন সম্ভব হয়েছে কিছু মহৎপ্রাণ ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতা ও সহমর্মিতায়। তাঁদের মহানুভবতার বিস্তার সংগঠনের কর্মিদের সবসময় উৎসাহ যোগাতো আর বিরল অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতো। সকল প্রকার আড়ষ্টতা, দ্বিধাগ্রস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে সংগঠনকে অগ্রসর করার কাজে ১৯৯০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত আমি (মো. তাজুল ইসলাম রাজু) নিজেও সচেষ্ট ছিলাম সুখের এক অনুভূতি নিয়ে।

যুগপূর্তি অনুষ্ঠানে পরিচালনা কমিটি
যুগপূর্তি অনুষ্ঠানে পরিচালনা কমিটি

এই যেন একটি প্রবাহধারা। দক্ষ ও বিজ্ঞজনের হাত ধরেই নির্দিষ্ট লক্ষে প্রবাহিত এর বেগবান স্রোতধারার অবগাহন করে শান্তির যাত্রা লাভ করছে অনেক তৃষিত মন। আর নতুন জীবনীশক্তি ধারনে উজ্জীবিত হয়ে সমাজকে করছে প্রাণবন্ত।

এ সংগঠন ত্বরিকতচর্চার পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা ও মনিবিক সেবায় অগ্রগামী ভূমিকায় শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি প্রদান ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, চিকিৎসা সেবায় অর্থ সহায়তা এবং গরীব অসহায় পরিবারের শিশুদের খতনার আয়োজন, মানবিক সেবায় বিভিন্ন সময়ে অসহায়দের ত্রাণ বিতরণ ছিল সংগঠনের প্রাণস্পন্দন পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের পথপ্রদর্শক রাহবারে আলম হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী (ম.) প্রকাশ- মওলা হুজুর কেবলার অনুপ্রেরণা ও সাংগঠনিক নির্দেশনা।

-এইখানে এই সংগঠনের চলার গতির বিশেষত্ব। নদী যেমন অনন্ত সাগর পানে ছুটে চলে, তেমনি অনন্ত শান্তিধারার হাতছানিতে এ সংগঠন ত্বরিকত চর্চা তথা সামাজিকতা ও মানবিকতার ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়ের কালাতিক্রম করছে।

এ সংগঠনে আগামীতে প্রয়োজন শিক্ষা, ত্বরিকত ও বাংলার লোকজ সাংস্কৃতিক চর্চায় সমসমায়িক অবদান নিয়ে কাজ করা এবং নবীন-প্রবীণের সমন্বয়কে জাগিয়ে তুলে সংগঠনের কর্মকাণ্ডকে প্রাণচঞ্চল করে রাখা।

ভাবতে হবে, যুগে যুগে আদর্শ মানুষের শুভ আবির্ভাবে সমাজ হয়েছে সুন্দর, আবার আদর্শ বর্জিত অপশক্তিতে মত্ত মানুষের আবির্ভাবে সমাজে প্রশ্রয় পেয়েছে অনাসৃষ্টি, অসুন্দর মন-মানসিকতা। মানুষ সবসময় জীবনকে প্রীতিমধুর করতে চাই। শক্তিধর মহৎপ্রাণগুলোকে সাথে নিয়ে কঠোর কঠিন সময়গুলো সহজিয়া করতে চাই, এতে প্রয়োজন ভাতৃত্ববোধ, সহানুভতি, পরামর্শ ও সার্বিক সহযোগিতা।

মহাকালের নিরবচ্ছিন্ন স্রোতে সংগঠনের সাথে জড়িত অনেকেই এখন অতীত হয়ে গেছে কিন্তু অনেকগুলো মানুষের শ্রম আর মেধার ফসল হিসেবে এখনো আলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ‘খিতাপচর হকভাণ্ডারী স্মরণ সভা সংসদ’। জ্ঞাত-অজ্ঞাতসারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে অস্তিত্ববান থাকবে তাঁদের কৃতি-কর্ম।

পরিশেষ, স্বোপার্জিত কিছু স্বপ্নের হাতছানি, কিছু গগনচুম্বী লক্ষ্য, কিছু সুষ্টি করার উদগ্র বাসনা, সর্বোপরি জ্ঞান সাগরের বেলাভূমি হতে কিছু নুড়ি কুড়ানোর একগুচ্ছ আকাংখা- সমমনস্ক কিছু জ্ঞান চাতককে সংগে নিয়ে বহমান জীবনে স্রোতের এহেন কর্মস্পৃহা যুগিয়েছেন বিশ্বত্রাণকর্তা হযরত গাউসুল আজম শাহসুফি মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.) প্রবর্তিত মাইজভাণ্ডারী দর্শন।

‘ধর্ম-সাম্যের বাহক’ এ দর্শন প্রায় দুইশত বছর ধরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিন্তা-চেতনা ও সমস্যা জর্জরিত সমাজে অন্য এক আলোকবর্তিকা সরূপ। সময়ের চাহিদা মোতাবেক এ দর্শনের পবিত্র সামিয়ানা তলে সচেতন মানুষ সমবেত হয়ে নিজেদের কু-প্রবৃত্তিকে দমন করে সুন্দর ভাবে সমাজ, সংসার এবং ব্যক্তিজীবনে সফল হবার মানসে একটি কঠিন অথচ মহান উদ্যেগকে সফলতার সাথী করে এমন কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে।

আশা করবো, এ অব্যাহত কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত সকলের সহমর্মিতা, সহযোগিতা, সর্বোপরি মহান আউলিয়া কেরামের নজরে-করম যেন সকল কর্মক্ষমতার প্রেরণার উৎস হয়ে থাকে।

May be an image of text

লেখক- সম্পাদক, আলোকিত বোয়ালখালী ও প্রতিষ্ঠাতা, হকভাণ্ডারী গণ পাঠাগার।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here