অনলাইন ডেস্ক

মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক হিমালয়প্রতিম ব্যক্তিত্ব। বাংলা সাহিত্য জগতের এক অমূল্য ধন। তিনি বাংলা সাহিত্যে এনে দিয়েছেন এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। তাকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক বলে মনে করা হয়। কিন্তু আজ আমরা গুরুদেবের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা না করে জানবো তার জীবন ধারার বিষয়ে।

স্কুলে অনীহা
রবী ঠাকুর কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ছিলেন পিতামাতার চতুর্দশ সন্তান। স্কুলশিক্ষায় ছিল তার অনাগ্রহ, তাই বাড়িতেই রাখা হয় গৃহশিক্ষক।

খুব কম ঘুমাতেন
রবীন্দ্রনাথের ঘুম ছিল খুব কম। তিনি খুব গভীর রাতে শুতেন আবার উঠে যেতেন প্রায় শেষ রাতে। সাধারণত তার দিন শুরু হতো প্রভাত স্নান দিয়ে। ঠিক ভোর ৪টায় এক কাপ চা পান করতেন। ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত একটানা লিখতেন। তারপর সকাল ৭টায় নাস্তা সেরে আবার লেখা। লেখার ফাঁকে ফাঁকে চা বা কফি খেতে পছন্দ করতেন তিনি। বেলা ১১টা পর্যন্ত টানা লিখে আবার স্নানে যেতেন। এরপরই খেতে বসতেন। রবীন্দ্রনাথ দুপুরে খাওয়ার পর ঘুমাতে বা বিশ্রাম নিতে তেমন পছন্দ করতেন না।
সন্ধ্যায় খেতেন রাতের খাবার
ঘণ্টাখানেক কোনো পত্রিকা বা বইয়ের পাতা উল্টে আবার লিখতে বসতেন। বিকেল ৪টায় চা, সঙ্গে কিছু নোনতা বিস্কুট। রবীন্দ্রনাথ রাতের খাবারটা সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সেরে ফেলতেন। রাতে তিনি বিদেশি খাবার খেতেই পছন্দ করতেন। আর দুপুরে সাধারণত বাঙালি খাবার খেতেন। রাতে খেয়েদেয়ে আবার একটানা রাত ১২টা পর্যন্ত চলতো লেখা বা পড়া। 

কুস্তিগির রবীন্দ্রনাথ
বালক রবীন্দ্রনাথ বাড়িতে পড়াশোনার পাশাপাশি গান ও আঁকা শেখা ছাড়াও প্রায় প্রতিদিন ভোরে বিখ্যাত কুস্তিগির হিরা সিংয়ের কাছে কুস্তি শিখতেন। নিয়ম মেনে চলা রবীন্দ্রনাথ শরীর চর্চাকে খুবই গুরুত্ব দিতেন। প্রতিদিনের নিয়ম ও খাদ্যাভাস দিয়েই রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি।
গান ও আবৃত্তি চর্চা
রবীন্দ্রনাথ যে শুধু লেখালেখি নিয়েই ব্যাস্ত থাকতেন তা কিন্তু না। লেখালেখির পাশাপাশি গান, নাচ এবং অভিনয়ও তিনি সমান তালে চালিয়ে যেতেন। ছোটবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথ গানের চর্চা করে এসেছেন। গবেষকদের মতে, রবীন্দ্রনাথ মাত্র ৭ বছর বয়সে তার জীবনের প্রথম গানটি গান। সে গানটি হলো তার খুড়তুতো দাদা গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘দেখিলে তোমার সেই অতুল প্রেম আননে’ গানটি। রবীন্দ্রনাথের গাওয়া প্রথম ডিস্ক বের হয় ১৯০৫ সালে। একপিঠে ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ অন্যপিঠে স্বরচিত ‘সোনার তরী’ কবিতার আবৃত্তি।

নাচকেও বাদ দেননি
রবীন্দ্রনাথ খুব ভালো ‘বলডান্স’ করতে পারতেন। তাঁকে নাচ শিখিয়েছিলেন খুড়তুতো দিদি সত্যেন্দ্রবালা ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ নানা দেশের নানা ধরনের নৃত্যশৈলী দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর নিজস্ব নৃত্যশৈলীর জন্ম দিয়েছিলেন। তবে তিনি সবসময় বলতেন, নাচের টেকনিক যেন গানের ভাবকে ছাড়িয়ে না যায়।
মঞ্চ অভিনেতা
রবীন্দ্রনাথ ১৬ বছর বয়সে জীবনের প্রথম মঞ্চ অভিনয় করেছিলেন। নিজের লেখা নাটকে প্রথম অভিনয় করেছিলেন ‘বাল্মিকী প্রতিভা’য় বাল্মীকির ভূমিকায়। অভিনয়ের জন্যে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং মঞ্চে অবতীর্ণ হন মোট ১০১ বার।

রঙের খেলা ছিল শখ
রবীন্দ্রনাথের অনেক শখের মধ্যে আরো একটি শখ ছিল ছবি আঁকা। জীবনের অনেক আগে আঁকা শুরু করলেও নিয়মিত ছবি আঁকতে শুরু করেন ৬৭ বছর বয়সে। ১৯০১ থেকে ১৯৪০, এই চল্লিশ বছরে সাদা কালো ও গাঢ় রঙে ছোট বড় মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথ ছবি এঁকেছিলেন প্রায় ৩ হাজার।
একজন বৃক্ষপ্রেমী
রবীন্দ্রনাথ শুধু কাব্যপ্রেমীই ছিলেন না তিনি একজন বৃক্ষপ্রেমীও ছিলেন। তার গানে ও কবিতায় ছড়িয়ে আছে অসংখ্য উদ্ভিদ আর ফুলের নাম। শুধু কাব্যেই উল্লেখ আছে ১০৮টি গাছ ও ফুলের নাম। এর মধ্যে বেশ কিছু বিদেশি ফুলের বাংলা নাম দিয়েছিলেন কবি স্বয়ং। তার দেয়া কয়েকটি ফুলের নাম হলো- অগ্নিশিখা, তারাঝরা, নীলমণিলতা, বনপুলক, বাসন্তী।
কবির পোশাক
গুরুদেব বাড়িতে সাধারণত গেরুয়া বা সাদা রঙের জোব্বা আর পায়জামা পরতেন। এছাড়া তিনি উপাসনা বা সভা সমিতিতে যাওয়ার সময় জোব্বা ছাড়াও সাদা ধুতি, জামা ও চাদর ব্যবহার করতেন। ঋতু উৎসবে ঋতু অনুযায়ী নানা রঙের রেশমী উত্তরীয় ব্যবহার করতেন। যেমন বর্ষায় কালো বা লাল, শরতে সোনালি, বসন্তে বাসন্তী রঙের। কখনো কখনো জোব্বার রঙও হতো উত্তরীয়র রঙের।
হোমিওপ্যাথিকেই বিশ্বাস
রবীন্দ্রনাথের হোমিওপ্যাথি পদ্ধতিতে চিকিৎসার প্রতি আগ্রহ ছিল খুব বেশি। তিনি নিজেও হোমিওপ্যাথি পদ্ধতিতে চিকিৎসা করতেন। হেলথ কো-অপারেটিভ তৈরি করে চিকিৎসার ব্যবস্থা ভারতে রবীন্দ্রনাথই প্রথম চালু করেন।
Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here