ইকবাল হায়দার
রোজা শব্দের অর্থ হচ্ছে “দিন” আর আরবীতে নাম সাওমা বা সিয়ামা যার অর্থ কোন কাজ থেকে বিরত থাকা। রোযা বা রোজা, (ফার্সি রুজে) সাওম (আরবী সাউম) বা সিয়াম ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল ভিত্তির তৃতীয়। সুবেহ সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার এবং সেই সাথে যাবতীয় ভোগ বিলাস থেকে বিরত থাকার নাম রোজা। অন্যভাবে অধ্যাপক মো: মতিউর রহমান রোজা ও ঈদের তাৎপর্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার এক লেখায় বলেছেন, আরবী “রমজ” শব্দ থেকে রোজা শব্দের উৎপত্তি। “রমজ” অর্থ পোড়ানো বা জ্বালানো। আগুনে পুড়িয়ে কোনো ধাতেুকে যেমন নিখাদ করা হয়, রোজাও তেমনি। রোজা মানুষের অসৎ প্রবৃত্তিকে নাশ করে সুপ্রবৃত্তির বিকাশ ঘটায়। প্রত্যেক মানুষের স্বভাবে দুটি বিপরীতমুখী প্রবনতা রয়েছে, একটি সৎ, অন্যটি অসৎ। রোজা অসৎ প্রবৃত্তি পুড়িয়ে মানুষের মধ্যে সৎ প্রবৃত্তি সৃষ্টি করে, মানুষকে সত্যিকারে নিখাদ মানুষে পরিনত করে। ঈদ মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ এক নেয়ামত।
রমজানের রোজা মুসলমানদের জন্য এক বিশেষ প্রাপ্তি। এ রোজা মুসলিম জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মসংযম, আত্মশোধনের ক্ষেত্রে এক বিশাল ভূমিকা পালন করে থাকে। মানুষ রোজার শেষে নিষ্পাপ, নির্দোষ, নির্ভেজাল স্বচ্ছ জীবন লাভ করে থাকে ঈদুল ফিতর উদযাপনের মদ্য দিয়ে। সারা বছরে তার দেহে ও প্রাণে জমে ওঠে নানা রোগ, শোক, কুস্বভাব, কুপ্রবৃত্তি, কুদৃষ্টি ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণ ও সংযম সাধনের মাধ্যমেই রোজা ও ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য নিহিত। প্রকৃত প্রস্তাবে সুষ্ঠুও ধর্মীয়ভাবে সিয়াম সাধনের মাধমেই মুসলিম নর নারী লাভ করে প্রকৃত সাফল্য। এ সাফল্যর নিদর্শন হলো ঈদ উদযাপন। ঈদ হলো গরিব, দু:খী, অসহায়ও নি:স্বজনের মাধ্যে যার যা সামর্থ্য আছে তা দেদার বিলিয়ে একাত্মতা তথা এক কাতারে দাঁড়ানোর আনন্দ ও মহামিলন।
ঈদ মুসলমানদের প্রতীক্ষিত এক মহা আনন্দ উৎসব। এই উৎসব এখন বাংলাদেশের প্রধানতম সাংস্কৃতিক প্রথা। ঈদ বাঙালি মুসলমানদের বড় উৎসব। প্রায় সহস্র বছরের পথপরিক্রমায় মুসলমাান সংখ্যা গরিষ্ঠাতার কারণে এদেশে ঈদ এখন বহু মাত্রিক সামাজিক সাংস্কৃতিক উপাচার। বর্নিল আয়োজন নান্দনিক বোধের জীবনঘনিষ্ঠ এক মানবিক আচার অনুষ্ঠান। আর এভাবে বাঙালির ঈদ উৎসবের জায়গা করে নিয়েছে শিল্প, সাহিত্য ও সংগীতের নান্দনিকতায়ও।
সাহিত্যতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদরা বলেন বিশ শতকের গোড়ার দিকের বাংলা কবিতায় ঈদ নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়। ১৯০৩ সালের ডিসেম্বর মাসের ঈদ সংখ্যায় সৈয়দ এমদাদ আলী তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক নবনূর পত্রিকায় ঈদ বিষয়ক প্রথম “ঈদ” কবিতাটি প্রকাশ করেন। এই কবিতার দুটি স্তবক উদ্ধৃত করছি।
কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে / তরুণ অরুণ উঠিছে ধীরে
রাঙিয়া প্রতি তরুর শিরে / আজ কি হর্ষ ভরে।
আজি প্রভাতের মৃদুল বায় / রঙে নাচিয়ে যেন কয়ে যায়
‘মুসলিম জাহান আজি একতায় / দেখ কত বল ধরে?’
ইহাই মুসলিম বাংলার প্রথম ঈদ কবিতা। ১৯৩০ সালে প্রথম প্রকাশিত সৈয়দ এমদাদ আলী–সম্পাদিত ‘নবনূর’ পত্রিকাই খুব সম্ভবত প্রথমবার ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করে । ১৯০৩, ১৯০৪, ১৯০৫– পর পর এই তিন বছরই ‘নবনূর’ ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করে, ‘এই অর্থে অন্তত যে প্রত্যেক বছরই এই পত্রিকায় ঈদ সংক্রান্ত লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ‘নবনূর’ পত্রিকায় প্রধান সাহিত্যিক আবিস্কার ও ফসল সৈয়দ এমদাদ আলী নিজে এবং কায়কোবাদ (১৮৫৭–১৯৫১) ও মিসেস আর. এস. হোসেন অর্থাৎ বেগম রোকেয়া (১৮৮০–১৯৩২)। এই তিনজন লেখকই ‘নবনূরে’ ঈদ–সংক্রান্ত কবিতা বা গদ্য লিখেছেন। ‘নবনূর’ এর পৌষ ১৩১১ সংখ্যায় কায়কোবাদ লেখেন ‘ঈদ’ শীর্ষক কবিতা।
ঈদ নিয়ে লিখেননি এমন কোন মুসলিম কবি সাহিত্যিক বা লেখক মিলবে না। ঈদ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে লেখালেখি হয়েছে বিপুল পরিমাণ। তাঁদের মধ্যে কাব্যে কবি সৈয়দ এমদাদ আলী সহ কবি কায়কোবাদ, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ, মোজাম্মেল হক, শেখ ফজলল করিম, শাহাদাৎ হোসেন, ড. মো: শহীদুল্লাহ, বেগম রোকেয়া, বেগম সুফিয়া কামাল, কবি মঈন উদ্দিন, তালিম হোসেন, আ ন ম বজলুর রশিদ, সৈয়দ আলী হাসান, কবি তোফাজ্জল হোসেন, কাজী আবদুল অদুদ, মো: ওয়াজেদ আলী, আশরাফ আলী খান এবং সঙ্গীতে কাজী নজরুল ইসলাম, মতিউর রহমান, তোফাজ্জল হোসেন, সিকান্দার আবু জাফর, আবুল হোসেন, আহসান হাবীব, সানাউল হক, আজিজুর রহমান, আশরাফ সিদ্দিকী, মনমোহন বর্মন ও কবি শামসুর রাহমান অন্যতম।
‘ঈদ আবাহন’ এই একই নামে কায়কোবাদ দুটি কবিতা লিখেছিলেন, একটি তাঁর অশ্রুমালা (১৩১১) গ্রন্থর্ভূত, অন্যটি তাঁর অমিয়ধারা (১৩২৯) গ্রন্থর্ভূত। দুটি কবিতাতেই ঈদ উপলক্ষে কায়কোবাদ কামনা করেছেন মুসলমানের জাগৃতি–
১. আজি এ ঈদের দিনে হয়ে সব এক মন প্রাণ,
জাগায় মোস্লেম সবে গাহ আজি মিলনের গান।
ডুবিবে না তবে আর ঈদের এ জ্যোতিস্মান রবি,
জীবন সার্থক হবে, ধন্য হইবে এ দরিদ্র কবি । [ঈদ আবহন, অশ্রুমালা]

